লালমনিরহাটে মাদক ও অনলাইন জুয়ার প্রতিবাদ করে আহত সেই কলেজশিক্ষক আরিফুল ইসলাম (৩৫) মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে অভিযুক্তদের বাড়িতে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে উত্তেজিত জনতা। এ ঘটনায় প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মবের ভয়ে ৩ ঘণ্টা পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গতকাল শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের গন্ধমরুয়া গ্রাম এবং সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের কর্ণপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় অভিযুক্তদের ৮টি বাড়িতে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে উত্তেজিত জনতা। সদর উপজেলার কর্ণপুর গ্রামের রহিদুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, বিপুল মিয়ার বাড়িতে ভাঙচুরের পর অগ্নিসংযোগ করা হয়। অপর দিকে আদিতমারী উপজেলার গন্ধমরুয়া গ্রামের ফজলার রহমান ও তাঁর ছেলে হৃদয়, রহিদুল ইসলামের পুরাতন বাড়ি, সহিদুল ইসলামের বাড়ি, সাইফুল ইসলামের পুরাতন বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে উত্তেজিত জনতা। অভিযুক্তরা সবাই আদিতমারী ও পার্শ্ববর্তী সদর উপজেলার বাসিন্দা।
এ ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকাটিতে। মবের ভয়ে প্রায় ৩ ঘণ্টা পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আদিতমারী ও সদর থানা-পুলিশসহ ফায়ার সার্ভিসের একটি দল। পরে তাঁরা আগুন ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ ঘটনায় অন্তত অর্ধকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ অপরিচিত কিছু লোক প্রথমে ভাঙচুর ও লুটপাট শুরু করে এবং পরে আগুন লাগিয়ে দেয়। ওই কলেজশিক্ষক আরিফুলকে আহত করার ঘটনায় অভিযুক্ত ১০ জনের ৮টি বাড়িতেই ভাঙচুর চালিয়েছে তারা।
ফায়ার সার্ভিসের বরাত দিয়ে সদর থানা-পুলিশ জানায়, নিহত আরিফুলের বাড়ি আদিতমারী থানার সীমান্তে হলেও অভিযুক্তদের ৪টি বাড়ি সদর থানার মোগলহাট ইউনিয়নের কর্ণপুর গ্রামে। এ চারটি বাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে প্রায় ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, মাদক ও জুয়াসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ নামে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছিল। এর অংশ হিসেবে আরিফুল ইসলাম নিজ গ্রামের মাদক ও অনলাইন জুয়া বন্ধে স্থানীয়দের সচেতন করেছিলেন। অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত গ্রামের রহিদুল ইসলাম, হাসান আলী, মেহেদী হাসান, পারভেজ, মমিন মিয়া ও হৃদয় মিয়াসহ কয়েকজনকে ডেকে জুয়া থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এরপর থেকেই তাঁর ওপর ক্ষোভ তৈরি হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, ১ আগস্ট কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে আরিফুলের ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় রহিদুলের নেতৃত্বাধীন একটি দল। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বিভিন্ন হাসপাতালে টানা ২১ দিন বেঁচে থাকার লড়াই করে অবশেষে গতকাল মৃত্যুর কাছে হার মানেন আরিফুল ইসলাম।
এদিকে ৬ আগস্ট আরিফুলের ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। সমাজকে আলোর মুখ দেখাতে গিয়ে শিক্ষক আরিফুল নিজের নবজাতক সন্তানের মুখটিও দেখতে পারেননি। তাঁর পরিবার এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
আরিফুলের ওপর হামলার ঘটনায় তাঁর বাবা ২ আগস্ট রহিদুলকে প্রধান করে ১০ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। সেই মামলায় ৮ জন আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। প্রধান অভিযুক্ত রহিদুলকে ১২ আগস্ট রাতে ঢাকার হাতিরঝিল নয়াটোলা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
নিহত কলেজশিক্ষক আরিফুল ইসলাম উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের গন্ধমরুয়া গ্রামের আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে। তিনি লালমনিরহাট সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের প্রভাষক ছিলেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ১৬ দিনের ফুটফুটে ছেলে আয়ান ও দুই বছরের মেয়ে আদিলা সিদ্দিকা মুমুকে কোলে নিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন আরিফুলের স্ত্রী সম্পা বেগম। এ সময় তিনি তাঁর স্বামীর হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবি জানিয়ে বলেন, ‘সমাজ আলোকিত করতে গিয়ে আমার স্বামী আজ আমাকে অন্ধকারে রেখে গেলেন। আমার অবুঝ সন্তানদের কী হবে? কী করে চলবে এ সংসার। টাকার জোরে খুঁনিরা হয়তো বেঁচে যাবে। আমাদের কী হবে? সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার যে স্বপ্ন আরিফুলের ছিল তা কীভাবে পূরণ করব?’
আরিফুলের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘আমার ছেলে একজন বীর। সমাজ আলোকিত করতে তাঁকে জীবন দিতে হলো। আমি চাই, ছেলের রক্তের বিনিময়ে সমাজ যেন মাদক-জুয়ার মতো অন্ধকার থেকে মুক্তি পায়। যারা তাঁকে হত্যা করেছে তাদের প্রত্যেকের ফাঁসি চাই।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদিতমারী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আতাউর রহমান বলেন, ‘শুরু থেকেই গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রধান অভিযুক্তকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে পাঠানো হয়েছে।’
আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব সজীব বলেন, ‘হামলার মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে নিতে আদালতে নথি পাঠানো হয়েছে। আর্জিনা বেগম নামে আরও একজনকে এ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমার থানা এলাকার ৪টি বাড়ি ভাঙচুর হলেও কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাদ আহমেদ বলেন, ‘আমার থানা এলাকার ৪টি বাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে। এতে প্রায় ৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হলেও কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।’
অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ‘খবর পাওয়া মাত্রই আমরা ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ পাঠিয়েছি। তারা যাওয়ার আগে যারা তাণ্ডব চালিয়েছে সেটাও তদন্ত করা হচ্ছে। মব সৃষ্টি কোনোভাবেই কাম্য নয়। পুলিশ গুরুত্বসহকারে পুরো মামলা তদন্ত করছে।’