চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব ১৫ বছরের জন্য দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন বামপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। এ সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিপেটা করেছে পুলিশ।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ভবনের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
বেলা ৩টায় আগারগাঁওয়ের ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটরিয়ামে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনসেশন চুক্তি সই হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের আপত্তি এবং প্রতিবাদের মধ্যেই চুক্তিটি সই করা হয়।
চুক্তি সইয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরুর সময় অডিটরিয়ামের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন কয়েকটি বামপন্থী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। এ সময় তাঁরা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। একপর্যায়ে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে লাঠিপেটা করে।
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেয় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), ডেমোক্রেটিক রেভল্যুশনারি পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, বাসদ (মার্ক্সবাদী), বাংলাদেশ সাম্যবাদী আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট, গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।
চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি প্রধান কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড়। জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে টার্মিনালটি।
আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের সময়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) ও সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) কাঠামোর আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া আবার শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে এ নিয়ে আলোচনা ও দর-কষাকষি জোরালো হলে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা ধর্মঘটে যান। পরে ওই বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে এনসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করে।
এরপর নতুন করে বিএনপি সরকার গত ৪ জুন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, আলোচনায় সহায়তার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ১২ সদস্যের একটি সহায়ক দল গঠন করে।
এনসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে বন্দর রক্ষা কমিটি। এর মধ্যে গণ-অনশন ও বিক্ষোভ মিছিলও রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা পরিষদও এই আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিদেশি অপারেটরের কাছে এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলে বন্দরের কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়বে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর গতি বাড়ানোর পাশাপাশি বন্দর ও লজিস্টিক অবকাঠামো খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাড়বে এবং আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কাজের সুযোগ পেয়ে স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতাও উন্নত হবে।
তবে চুক্তির বিরোধিতাকারীদের দাবি, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলে চট্টগ্রাম বন্দর আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে বন্দরের দক্ষ জনবল দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি দেশের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বিরোধিতাকারীদের আরও দাবি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে টার্মিনাল ইজারা দেওয়া হলে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে এবং বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যেতে পারে। একই সঙ্গে কনসেশন চুক্তির আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য খালাসের সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।