হোম > সারা দেশ > ঢাকা

ভিকারুননিসার শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা: বুলিং ও কোচিং-বাণিজ্যের অভিযোগ অভিভাবকদের

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান কয়েকজন অভিভাবক। আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর বেইলি রোডে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির মূল ক্যাম্পাসে। ছবি: আজকের পত্রিকা

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বসুন্ধরা শাখার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইবতিশাম রাফিফ ইসলাম আরিশার আত্মহত্যার ঘটনায় শিক্ষকদের বুলিং, হয়রানি এবং কোচিং বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন অভিভাবক। এসব অভিযোগ নিয়ে আজ সোমবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির বেইলি রোডের মূল ক্যাম্পাসে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগমের সঙ্গে কথা বলেছেন তাঁরা।

সাক্ষাৎ শেষে বেলা তিনটার দিকে ক্যাম্পাসের বাইরে সাংবাদিকদের কাছে নিজেদের অভিযোগ তুলে ধরেন অভিভাবকেরা। এ সময় এম এ এম ইফতেখার মোমিন, আনোয়ার হোসেন হাওলাদার, মো. গোলাম কিবরিয়া, আল আসমাউল হুসনাসহ কয়েকজন অভিভাবক উপস্থিত ছিলেন।

অভিভাবকদের দাবি, শিক্ষার্থীদের মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের আচরণ এবং ক্যাম্পাসে বুলিংয়ের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে আরিশার মৃত্যুর পেছনে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশের ভূমিকা ছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার দাবি জানান তাঁরা।

অভিভাবক ইফতেখার মোমিন বলেন, গত ১২ আগস্ট বসুন্ধরা শাখার এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তাঁরা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে গিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, ভিকারুননিসা একটি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর চারটি শাখার যেকোনো একটিতে এমন ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়ে। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন আমাদের বাচ্চাদের স্কুলে দিয়ে আসি, তখন ভেতরে কী হচ্ছে, তা সব সময় জানতে পারি না।’

ইফতেখার মোমিনের অভিযোগ, শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বুলিংয়ের বিষয়টি সম্প্রতি সামনে এসেছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যেও বুলিংয়ের ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেন তিনি। এসব ঘটনায় প্রশাসন কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা অধ্যক্ষের কাছে জানতে চেয়েছেন বলে জানান তিনি।

আরিশার মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে যথাযথভাবে শোক প্রকাশ করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন এই অভিভাবক। তিনি বলেন, ‘একটা বাচ্চা মারা গেল, অথচ তার জন্য একটি শোকবার্তা দেওয়া হলো না, এক মিনিট নীরবতা পালন করা হলো না। কেন এমন হলো, আমরা সেটাও জানতে চেয়েছি।’

একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে যে দায়বদ্ধতা থাকার কথা, তা যথাযথভাবে পালন করা হয়েছে কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অভিভাবকেরা।

কোচিং বাণিজ্য নিয়েও অভিযোগ

অভিভাবকেরা শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য নিয়েও অভিযোগ করেন। ইফতেখার মোমিনের দাবি, কোনো কোনো শিক্ষক কোচিংয়ে না পড়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করেন। এর ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং বুলিং বা হয়রানির ঘটনাও এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে মনে করেন তাঁরা।

ইফতেখার মোমিন বলেন, ‘আমরা কোচিং বাণিজ্য বন্ধ চাই। সরকার যে কোচিং বাণিজ্য বন্ধের উদ্যোগ ঘোষণা করেছে, আমরা তার সঙ্গে একমত। আমরা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে জোরালো সুপারিশ করব, যেন যেকোনো মূল্যে এই কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করা হয়।’ কোচিং বাণিজ্য বন্ধ না হলে শিক্ষার্থীদের বুলিং ও হয়রানিও বন্ধ হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। এমনকি একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পেছনেও কোচিং বাণিজ্যের ভূমিকা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন ইফতেখার মোমিন।

এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ধানমন্ডি শাখার তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী ৪৭ দিন ধরে ক্লাসে যেতে পারছে না বলেও জানান ইফতেখার মোমিন। ওই ঘটনাতেও কোচিং বাণিজ্যের বিষয়টি এসেছে বলে দাবি করেন এই অভিভাবক। কোচিংয়ের কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর আর্থিক চাপের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, ‘আমাদের মাসিক আয়ের একটি বড় অংশ বাচ্চাদের কোচিংয়ের পেছনে চলে যায়। স্কুলে পড়ার পরও যদি একই শিক্ষকের কাছে কোচিং করতে হয়, তাহলে স্কুলের প্রয়োজন কী?’

হেড গার্ল নির্বাচন নিয়েও অভিযোগ

হেড গার্ল নির্বাচন নিয়েও অভিভাবকদের অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, এই পদকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার ও তদবিরের সুযোগ তৈরি হয়। বিভিন্ন সময়ে হেড গার্ল ও তার প্যানেলকে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে বলে জানান তাঁরা।

অধ্যক্ষের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে ইফতেখার মোমিন বলেন, তাঁদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা হয়। এ সময় অধ্যক্ষ তাঁদের বলেছেন, বিষয়গুলো তিনি দেখছেন এবং সঠিক বিচার করবেন।

ইফতেখার মোমিন বলেন, ‘আমরা তাকে বলেছি, যে বাচ্চাটি মারা গেল, তার বিষয়ে সঠিক তদন্ত করতে হবে। যে শিক্ষকের বিরুদ্ধে বুলিংয়ের অভিযোগ আছে, তার বিরুদ্ধেও পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।’

অভিযোগ অস্বীকার অধ্যক্ষের

তবে অভিভাবকদের এসব অভিযোগ এবং শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম।

মুঠোফোনে তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘অভিভাবকদের সঙ্গে আমার এ ধরনের কোনো ইস্যু নিয়ে কথা হয়নি। তাঁরা স্বাভাবিকভাবে এসেছিলেন। আমাদের সঙ্গে অভিভাবক হিসেবে কথা হয়েছে।’

বসুন্ধরা শাখার এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা এবং এর পেছনে কোনো শিক্ষকের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাজেদা বেগম বলেন, ‘বসুন্ধরায় যে মেয়েটা আত্মহত্যা করেছিল, ওই মেয়েটার কোনো অভিযোগ ছিল না। এ বিষয়ে পত্রিকায়ও খবর হয়েছিল। তাদের কোনো অভিযোগ নেই। আমরা মনে করছি, মেয়েটার আত্মহত্যার বিষয়ে কিছু করা উচিত। এ ব্যাপারে আমরা তদন্ত করেছি।’