রাজধানীর হাতিরঝিল-রামপুরা-বনশ্রী-আমুলিয়া-ডেমরা সড়ককে চার লেনের নিয়ন্ত্রিত এক্সপ্রেসওয়েতে উন্নীত করার প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ করা হলেও শেষমেশ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন আপাতত হচ্ছে না। চীনা বিনিয়োগকারীর সঙ্গে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বিরোধ না মেটায় চুক্তি বাতিল হওয়ার পথে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আর্থিক হিসাবের ভিত্তি তারিখ বা ‘বেস ডেট’ পরিবর্তনের দাবি নিয়ে কয়েক দফা আলোচনার পরও সমঝোতা হয়নি। বিনিয়োগকারী চুক্তির আগের শর্তে প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজি নয়; অন্যদিকে প্রকল্প কর্তৃপক্ষও চুক্তির বাইরে গিয়ে বেস ডেট পরিবর্তনে রাজি হয়নি। ফলে বিদ্যমান পিপিপি চুক্তি বাতিল করে নতুন বিনিয়োগকারী খোঁজার পথে যাচ্ছে প্রকল্প দপ্তর।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের পিপিপি বিভাগের গত ৪ আগস্টের সভার কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সভায় চুক্তি বাতিলের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নতুন করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীনে নেওয়া প্রকল্পটির পিপিপি চুক্তি হয় ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি এই তারিখটি হলো প্রকল্পের আর্থিক হিসাবের ভিত্তি তারিখ বা ‘বেস ডেট’।
পিপিপি চুক্তি অনুযায়ী, চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়। প্রকল্পটির নাম ‘হাতিরঝিল-রামপুরা-বনশ্রী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ-শেখেরজাইগা-আমুলিয়া-ডেমরা মহাসড়ককে ৪-লেনে উন্নীত করা’। এই সড়কের সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সংযোগস্থল ও নারায়ণগঞ্জের তারাবতে যাওয়ার পথ যুক্ত করার কথা।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করার কথা। সড়কের দুই পাশে সার্ভিস লেন থাকবে। রামপুরা, মেরাদিয়া, ডেমরা ও শিমরাইল এলাকায় চারটি ইন্টারচেঞ্জ এবং ডেমরায় আট লেনের টোল প্লাজা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি নির্মাণে চার বছর এবং নির্মাণ শেষে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে আরও ২১ বছর ধরা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী এই সময়ে বিনিয়োগকারী এখান থেকে টোল তুলবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ধরন পিপিপি মডেলে। অর্থাৎ বেসরকারি বিনিয়োগকারী নিজ অর্থে প্রকল্পটি নির্মাণ করবে এবং পরে নির্দিষ্ট সময় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। এর পুরো অর্থ বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে আসার কথা। তবে সরকার বিনিয়োগকারীকে ২১ বছরের পরিচালনকালীন নির্দিষ্ট হারে ‘অ্যাভেইলেবিলিটি পেমেন্ট’ হিসেবে ১ হাজার ৬৭৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা দেবে। প্রকল্পে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ড বা ভিজিএফ রাখার কথা হয়নি।
সমস্যার শুরু মূলত ‘বেস ডেট’ নিয়ে। পিপিপি প্রকল্পে সরকার বেসরকারি বিনিয়োগকারীকে যে অ্যাভেইলেবিলিটি পেমেন্ট দেবে, তার আর্থিক হিসাব করতে একটি নির্দিষ্ট সময়কে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। ওই সময়ের নির্মাণ ব্যয়, পরিচালন ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, আয়-ব্যয় এবং বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশিত মুনাফার হিসাব ধরে পুরো আর্থিক মডেল তৈরি করা হয়। এই ভিত্তি সময় বা তারিখই বেস ডেট।
চীনা বিনিয়োগকারী ও সরকারের মধ্যে প্রকল্পটির পিপিপি চুক্তি হয় ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, চুক্তি স্বাক্ষরের এই তারিখটিই প্রকল্পের আর্থিক হিসাবের ভিত্তি তারিখ হিসেবে নির্ধারিত। এই তারিখ পরিবর্তন হলে প্রকল্পের আর্থিক হিসাবও বদলে যায়। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি পিপিপি প্রকল্পে নির্মাণসামগ্রীর দাম, পরিচালন ব্যয়, মুদ্রার বিনিময় হার ও অর্থের মূল্য পরিবর্তিত হওয়ায় বেস ডেটের সঙ্গে বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশিত মুনাফার হিসাবও যুক্ত থাকে।
পিপিপি বিভাগের সর্বশেষ সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, এই প্রকল্পে বিনিয়োগকারী চীনা কনসোর্টিয়াম ২০২৩ সালের মে মাসে বেস ডেট পরিবর্তনের দাবি তোলে। চীনা বিনিয়োগকারীদের দাবি, পিপিপি চুক্তির পরবর্তী কোনো তারিখ নয়, ২০১৯ সালের জুলাইয়ে দরপত্র জমা দেওয়ার সময়কে বেস ডেট হিসেবে ধরতে হবে। এর কারণ হিসেবে তারা ডলারের দর বাড়াসহ প্রকল্পের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা বলেছে। বিনিয়োগকারীদের মতে, বর্তমান শর্তে বিনিয়োগ করলে প্রত্যাশিত মুনাফা বা অভ্যন্তরীণ রিটার্ন রেট (আইআরআর) পাওয়া যাবে না।
এ পরিপ্রেক্ষিতে সমঝোতার জন্য প্রকল্প কর্তৃপক্ষ তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দেয়। প্রথমটি ছিল ২০২২ সালের ৯ অক্টোবরকে বেস ডেট ধরা—চুক্তি স্বাক্ষরের নয় মাস পর শর্ত পূরণের সম্ভাব্য সময় বিবেচনায় নিয়ে। দ্বিতীয়টি ছিল ২০২৩ সালের ৯ জুলাই—চুক্তি স্বাক্ষরের ১৮ মাস পর শর্ত পূরণের দীর্ঘতম সময়সীমা বিবেচনায় নিয়ে। তৃতীয় বিকল্প ছিল বেস ডেট না বদলে কনসেশন বা পরিচালনার মেয়াদ বাড়ানো।
কিন্তু প্রকল্প কর্তৃপক্ষের তিন প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করে চীনা কনসোর্টিয়াম।
সওজ কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে নির্ধারিত আর্থিক কাঠামো চুক্তির মাঝপথে বড়ভাবে বদলালে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। এতে অন্য দরদাতারাও প্রশ্ন তুলতে পারেন। তাই নতুন আর্থিক কাঠামো হলে নতুন করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পক্ষেই তাঁরা মত দিয়েছেন।
বিরোধের মধ্যেই প্রকল্পের ‘কন্ডিশনস প্রিসিডেন্ট’ বা চুক্তি কার্যকরের পূর্বশর্ত পূরণের প্রক্রিয়া চলছিল। তবে এসব শর্ত পূরণের নির্ধারিত সময়সীমা ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ শেষ হয়েছে। বিনিয়োগকারী ওই সময়সীমা বাড়াতেও সম্মত হয়নি।
অন্যদিকে, প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও হস্তান্তরের কাজ এগিয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২৫ দশমিক ৮১৭১ একরসহ চারটি প্যাকেজে ৩০ একরের বেশি জমি সওজকে হস্তান্তর করা হয়েছে। জুন পর্যন্ত সংযোগ সড়কের আর্থিক অগ্রগতি ৭৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ হলেও মূল পিপিপি প্রকল্পের নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্প এলাকায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অবকাঠামো সরানোর কাজ চলছে। বিদ্যুতের খুঁটি ও তার এবং সঞ্চালন টাওয়ার সরাতে ডিপিডিসি ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি কাজ শুরু করেছে। গ্যাস পাইপলাইন সরাতে ঠিকাদার নিয়োগ করেছে তিতাস গ্যাস।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. জিকরুল হাসান আজকের পত্রিকায় বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা যেহেতু প্রকল্পের কাজ করবে না, তাই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সেটি বাতিলের দিকে যেতে হবে। মন্ত্রণালয় থেকেই চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া করা হবে। প্রকল্পটি ২০১৯ সালে টেন্ডার করা হয়েছিল। এখন সময়ের সঙ্গে মিল রেখে প্রকল্পটি নতুন করে মূল্যায়ন ও হালনাগাদ করে পিপিপি কাঠামো তৈরি করতে হবে। এরপর দ্রুত ওপেন টেন্ডারে যাওয়া হবে। চুক্তি বাতিল হলেও প্রকল্পটি থেমে থাকবে না।’
তবে তিনি জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন করে সময় লাগবে। জমি অধিগ্রহণসহ প্রস্তুতিমূলক কাজে সরকারি বিনিয়োগ হওয়ায়, বর্তমান বিনিয়োগকারী রাজি না হলে নতুন কাঠামোয় দ্রুত প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে চায় সরকার।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘পিপিপি প্রকল্পের মূল ভিত্তি হলো ফিন্যান্সিয়াল মডেল। বেস ডেট পরিবর্তন করলে ডলারের বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি, ঝুঁকি বণ্টনসহ পুরো মডেলেই প্রভাব পড়বে। তাই চুক্তিতে নির্ধারিত বেস ডেট পরিবর্তন করা ঠিক হবে না। বর্তমান বিনিয়োগকারী রাজি না হলে সরকার বিকল্প অর্থায়ন বা নতুন কনসেশনার খুঁজতে পারে। যেহেতু জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ, তাই প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’