হোম > সারা দেশ > ঢাকা

গণভোটে এক ছিলাম, শপথের দিন থেকেই সমস্যা শুরু: সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

ছবি: সংগৃহীত

গণভোটের পক্ষে সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে থাকলেও সংসদ সদস্যদের শপথের দিন থেকে সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘সমস্যা’ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, গণভোটে-সংস্কারের পক্ষে জনগণের রায় পাওয়ার পরও তা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

আজ বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান।

শফিকুর রহমান বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে দীর্ঘ আলোচনার পর যেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তার ভিত্তিতে ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের আমরা যতটুকু হোক কার্যকারিতা পেলাম, কিন্তু গণভোটের বিষয়ে কোনো সুরাহা নেই। ৬৮ দশমিক ২ ভাগ মানুষ গণভোটে “হ্যাঁ” বলেছেন, রায় দিয়েছেন।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন শফিকুর রহমান। বিরোধী দলও একই অবস্থানে ছিল বলে জানান তিনি।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘ওই পর্যন্ত তো আমরা এক ছিলাম। কিন্তু এরপরে যেদিন আমাদের শপথ হলো, সেদিন থেকে এই জায়গাটায় আমাদের সমস্যা তৈরি হয়ে গেল এবং আজ পর্যন্ত এর কোনো সুরাহা নাই।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘যে দলই সরকার গঠন করুক, দেশে যেন আবার ফ্যাসিবাদ, বৈষম্য ও রাজনৈতিক নিপীড়ন ফিরে না আসে। আমরা চেয়েছিলাম যে দলটি নির্বাচিত হয়ে দেশ এবং জনগণকে পরিচালনা করবে, সরকার গঠন করবে, তাদের মধ্যে আর যেন ফ্যাসিবাদ কাজ না করে, আর যেন কোনো বৈষম্য না হয়, আর যেন কোনো মায়ের বুক অপ্রয়োজনে অহেতুক খালি না হয়।’

রাষ্ট্রে ‘আমূল পরিবর্তনের’ লক্ষ্যেই গণভোট হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। সাধারণ আইন বা সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে কাঠামোগত সংস্কারের পার্থক্য রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদে কোনো সংশোধনী পাস হলেও পরে আদালতে তা নিয়ে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আজকে এখানে কোনো বিল আকারে আসবে, আমরা এটা পাস করে দেব, কালকে আদালত চাইলে এটাকে চ্যালেঞ্জ করে শেষ করে দেবে। এরকম উদাহরণ একটা নয়, দুইটা নয়, অনেক।’

সংস্কার পরিষদ বা গণপরিষদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হলে তার আইনি ভিত্তি আরও শক্ত হতো বলেও মত দেন শফিকুর রহমান।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদে খোলামেলা আলোচনা করে এমন সংস্কার করতে হবে, যাতে ফ্যাসিবাদী শাসন আর ফিরে না আসে। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। আমি অনুরোধ করব, বিষয়টা সরকার যেন বিবেচনায় নিয়ে জনরায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে জন-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন করে।’

বিচার বিভাগের জন্য স্বাধীন সচিবালয় গঠনের উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন শফিকুর রহমান। বর্তমান সরকারের সময়ে সেই উদ্যোগ আর দৃশ্যমান নয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এই ওয়াদাটা বর্তমান সরকারি দলেরও ছিল। বিচার বিভাগকে স্বাধীনতা দেওয়া হবে। কিন্তু এটা এখন আবার হারিয়ে গেছে। জাতি এখানে এসে ধাক্কা খেল।’

ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান।

জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিচারপ্রক্রিয়ায় যতটুকু দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছিল, বর্তমান সরকারের ছয় মাসে তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।

জুলাই আন্দোলনের সময় নিহতদের মধ্যেই বিচার সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। পরবর্তী সময়ে যাঁরা হত্যার শিকার হয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা যারা বিরোধীদলীয় সদস্য এখানে আছি, তারা আমাদের ন্যায্য অধিকারটা সমানভাবে পাচ্ছি না।’

উন্নয়ন তহবিল বরাদ্দে প্রথমে বৈষম্য দেখা গেছে বলে অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যরা বরাদ্দ পেলেও বিরোধী দলের নারী সদস্যরা তা পাননি বলেও দাবি করেন তিনি।

সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় দায়িত্ব দেওয়ার পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ব্যক্তিগত আক্রমণ এড়িয়ে যৌক্তিকভাবে বক্তব্য তুলে ধরতে চান বলে জানান তিনি।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান অস্বীকার করা যায় না। তবে দুই দেশের সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। সীমান্ত হত্যা, তিস্তা ও গঙ্গার পানি বণ্টনের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান দাবি করেন বিরোধীদলীয় নেতা।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘এখানে আলোচনা হবে, লড়াই হবে সমানে সমান। আমরা কারও অধীনতা মেনে নেব না। বাংলাদেশ আর কারও অধীনে তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে না।’

আসন্ন পানি চুক্তি নবায়নের আলোচনায় সরকারকে ‘শক্তিশালী নীতি’ নিয়ে এগোনোর আহ্বান জানান তিনি।

দেশের শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট নিয়েও উদ্বেগ জানান শফিকুর রহমান। উৎপাদন কমতে থাকলে শিল্পমালিকদের পক্ষে ঋণ পরিশোধ, শ্রমিক ধরে রাখা এবং বিদেশি ক্রেতা ধরে রাখা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘একবার যদি বায়ার আমাদের থেকে ফিরিয়ে অন্যদিকে চলে যায়, আবার সেই বায়ার তখন আসে না।’

শিল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট বন্ধের আহ্বান জানান তিনি।

সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত একটি আইন নিয়েও আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় নেতা। আইনটি কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করেন তিনি।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি অনুরোধ করব মাননীয় রাষ্ট্রপতি যেন এটাতে স্বাক্ষর না করেন।’

আইনটি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কাছে পাঠিয়ে আলেম ও স্কলারদের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা।