হোম > সারা দেশ > ঢাকা

দেড় ঘণ্টা লুকিয়ে রাখা হয় ফুল বিক্রেতা জাহিদের লাশ

অর্চি হক, ঢাকা 

জাহিদ হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

১৮ বছরের জাহিদ হোসেন সেদিন মায়ের কোলে শুয়ে বলেছিলেন, ‘আম্মু, মাথাটা একটু আঁচড়াইয়া দিবা?’ রাহেলা বেগম এখনো বিশ্বাস করতে পারেন না, সেটাই ছিল ছেলের শেষ আবদার।

রাজধানীর মহাখালী রেলগেট এলাকায় রাস্তার পাশে অস্থায়ী একটি ফুলের দোকান চালাতেন সদ্য কৈশোর পেরোনো জাহিদ। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। পরিবারের অসচ্ছলতার কারণে ক্লাস সেভেনের পরেই কাজে নামতে হয়েছিল তাঁকে। নিজের হাতে বানানো ফুলের মালা ও তোড়া বিক্রি করেই কাটত তাঁর দিন। কিন্তু চব্বিশের উত্তাল জুলাই সব বদলে দিল।

১৯ জুলাই, শুক্রবার। সকাল থেকেই মহাখালী এলাকার সড়কের পরিস্থিতি উত্তপ্ত। আগুনে পুড়ছে যানবাহন, চারদিকে গুলির খবর। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে বাসায় ফিরে মা রাহেলা বেগম বারবার ছেলেকে অনুরোধ করেন, সেদিন আর বাইরে না যেতে। ঘরের দরজায় তালাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আটকে রাখতে পারেননি জাহিদকে।

রাহেলা বেগম বলছিলেন, ‘বাসায় আইসা কইলাম, “বাবা, আজকে গুলির অর্ডার আছে শুনছি। আজকে বাইরে যাইয়ো না।” ও কইল, “ঠিক আছে আম্মু, যামু না।” কিন্তু আমার ভিতরটা কেমন জানি কাঁপতেছিল। মনে হইতেছিল, আজকে কিছু একটা হইব।’

জাহিদের মা জানান, ১৬ জুলাই থেকে মহাখালী রেলক্রসিং এলাকার রাস্তায় আন্দোলনে ছিলেন জাহিদ। ১৮ জুলাই তাঁর পিঠে রাবার বুলেট লেগেছিল। কিন্তু সে কথা বাসার কাউকে জানাননি।

পরে ছেলের বন্ধুদের কাছে এ কথা শুনেছিলেন রাহেলা। তিনি বলেন, ‘আমি যদি জানতাম, আগের দিনই ওর গায়ে রাবার বুলেট লাগছে, আমি তো ওরে যাইতে দিতাম না।’

মাকে শান্ত রাখতে ১৯ তারিখ বাসার অনেক কাজ করে দিয়েছিলেন জাহিদ। জুতা সেলাই করে এনেছিলেন, হাঁড়ি-পাতিল ধুয়ে দিয়েছিলেন। একসময় পরিবারের সবার সঙ্গে বসে দুপুরের খাবার খান।

রাহেলা বেগম বলেন, ‘সব কাজ কইরা দিল। মনে হইতেছিল, ও চাইতেছিল আমি যেন আর কিছু না কই। দুপুরে একসাথে ভাত খাইলাম। তারপর ওরে শুয়াইয়া দিলাম।’

সন্তানহারা এই মা জানান, দুপুরের দিকে জাহিদ খুব অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। বারবার জানালা দিয়ে নিচে তাকাচ্ছিলেন। একসময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি একটু নিচে যাই, আইসা পড়মু।’

রাহেলা বেগম মোবাইল ফোন নিয়ে যেতে বললেও জাহিদ নেননি। প্রায় নতুন যে জুতা পরে প্রতিদিন বের হতেন, সেটিও সেদিন রেখে গিয়েছিলেন। বের হন পুরোনো জুতা পরে।

আজও সেই দৃশ্য ভুলতে পারেন না রাহেলা। ‘এখন মনে হয়, ও হয়তো বুঝছিল যে শহীদ হইব। তাই মোবাইলও নেয় নাই, নতুন জুতাও পরে নাই,’ আর কথা এগোতে পারেন না তিনি। গলা ধরে আসে।

জাহিদের বাবা জাহাঙ্গীর আলম সেদিনের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘জুমার নামাজের পরে আমরা একসাথে ভাত খাইছি। দেখলাম, মায়ের কোলে শুইয়া চুল আঁচড়াইয়া দিতে বলছে। ওর ১৮ বছরের জীবনে সেই প্রথম দেখছি, মায়ের কাছে এইভাবে নিজে আদর চাইতেছে।’

বাবাও পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ঘরের বাইরে বের হতে নিষেধ করেছিলেন জাহিদকে। কিন্তু ছেলে বারণ শোনেননি। নিচে নেমেই বন্ধুদের সঙ্গে রাস্তায় চলে যান।

রাহেলা বেগম জানান, একবার এসে বাসা থেকে একটা হেলমেট নিয়ে গিয়েছিলেন ছেলে। সম্ভবত মাথায় গুলি লাগবে না এই আশায়। কিন্তু মহাখালীর বাসা থেকে বের হওয়ার ঘণ্টাখানেক পরই একটা গুলি এসে লাগে জাহিদের মাথার পেছনে। তিনি তখন ছিলেন রেলক্রসিং এলাকায় আরজতপাড়ার প্রবেশমুখে। গুলিবিদ্ধ হয়েই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন জাহিদ।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা থেকে জাহাঙ্গীর আলমের ধারণা, মহাখালী ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে কোনো স্নাইপার গুলি করেছিল জাহিদকে। ঘটনাস্থলের দুই মিনিটের দূরেই ইউনিভার্সাল হাসপাতাল। কিন্তু সে পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ পাননি জাহিদ।

বাবা-মায়ের অভিযোগ, মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও মৃত্যু নিশ্চিত করতে মারধর করা হয়েছিল জাহিদকে।

রাহেলা বেগম জানান, বন্ধুরা কোনোমতে উদ্ধার করে জাহিদকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশের ভয়ে হাসপাতাল তাঁকে রাখতে চায়নি।

এরপর শুরু হয় আরেক বিভীষিকাময় অধ্যায়। হাসপাতাল থেকে জাহিদের লাশ নিয়ে বের হওয়ার পর তা সরাসরি বাসায় আনা যায়নি।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘পুলিশের ভয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা এক গলি থেইকা আরেক গলিতে লুকাইয়া রাখতে হইছে। লাশ কই রাখব, কী করমু—এই অবস্থা।’

শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্টে এলাকার একটি মসজিদে মরদেহের শেষ গোসল করানো হয়। জানাজার আয়োজন করতেও নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। তড়িঘড়ি করে নাখালপাড়া কবরস্থানে জাহিদকে দাফন করা হয়। শেষবারের মতো ছেলেকে একটু ছুঁয়ে দেখারও সুযোগ পাননি মা রাহেলা।

জাহাঙ্গীর আলম জানান, ছেলের মৃত্যুর পরও তাঁর পরিবারের দুর্ভোগ শেষ হয়নি। জাহিদের বন্ধুদের অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বড় ছেলে রাহাত হোসেনের খোঁজে পুলিশ তল্লাশি চালায়। পরিবারের সদস্যদের কয়েক দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি চলে যেতে হয়েছিল।

দুই বছর পেরিয়ে গেলেও জাহাঙ্গীর আলম আর রাহেলা বেগমের সময় যেন সেই দিনটাতেই থেমে আছে। ছেলের মৃত্যুর পর তাঁরা বাসা বদলেছেন। কিন্তু ঘরের প্রতিটা আসবাবেই যেন লেগে আছে ছেলের স্মৃতি।

রাহেলা বেগম বলেন, ‘বাইরে যাওয়ার সময় ও কইত, “আম্মু, ১০ টাকা দেন বা ২০ টাকা দেন।” এখন তো ওই ডাকটা নাই।’

জাহাঙ্গীর আলম জানান, তাঁর বড় ছেলে রাহাত হোসেন উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন। ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া হয়নি। পরিবারকে সহায়তা করতে বাস কাউন্টারে চাকরি নিয়েছেন তিনি।

জাহিদের পরিবারের অভিযোগ, সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের কোনো খোঁজখবর নেওয়া হয় না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ৫ লাখ টাকা পেয়েছিলেন। এ পর্যন্তই। শহীদ পরিবারের জন্য ফ্ল্যাটের যে ঘোষণা হয়েছে, সে ব্যাপারেও কোনো কিছু জানেন না তাঁরা।

রাহেলা বেগমের চাওয়া, সরকার তাঁদের খবর নিক। জাহিদ হত্যার বিচার হোক। তিনি বলেন, ‘সন্তান তো আর ফিরা পামু না। অন্তত সরকার শহীদ পরিবারগুলার খবর নেক। পরিবারের লোকের জন্য ভালো চাকরির ব্যবস্থা করুক। আর বিচারটা করুক। দুই বছর ধইরা শুধু শুনতেছি বিচার হইব। কিন্তু বিচার তো এখনো হইল না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: জুলাইয়ের স্মৃতি রক্ষায় দেয়ালে গ্রাফিতি পুনর্লিখন শুরু

রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনা: সাড়ে ৬ বছরে নিহত ১,৩৮৪

‘চিনিগুঁড়া’ বলে কম দামে সুগন্ধিযুক্ত মোটা চাল বিক্রির অভিযোগ, প্রতারিত হচ্ছে ক্রেতা

কেরানীগঞ্জে ১০ দিন ৭ মরদেহ উদ্ধার, উদ্বেগে এলাকাবাসী

জুলাইকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চলছে: জাহাঙ্গীর শিকদার

ডিএসসিসির ৭৫ ওয়ার্ডে একযোগে পালিত হলো ‘ক্লিনিং ডে’

রাজধানীতে মাদকসহ কারবারি গ্রেপ্তার

সিটিটিসির পৃথক অভিযানে প্রায় ৭ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ৩

সিএজি নূরুল ইসলামের অপসারণের দাবিতে মানববন্ধন

বিদেশি পিস্তল ও ছিনতাই হওয়া ২৫ মোবাইলসহ গ্রেপ্তার ১