হোম > সারা দেশ > ঢাকা

রাজস্ব আদায় না বাড়ায়, বাড়ছে ঋণনির্ভরতা

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

প্রতীকী ছবি

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকার ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ নেওয়ার চেয়ে ৬ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করেছিল সরকার। কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আদায় না হওয়া এবং সরকারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না। এর ফলে ব্যয় মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে সরকারকে। এর মধ্যে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারের ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, সরকারের আয়ের সক্ষমতার তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি বলে ঋণ নিতে হচ্ছে। নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়ায় চলতি অর্থবছরে ব্যয় আরও বাড়বে। অথচ রাজস্ব আদায় বাড়ানোর তেমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে সরকারের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৯ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই খাতে নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ঋণাত্মক ৪ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ তখন সরকার ঋণ নেওয়ার চেয়ে বেশি পরিশোধ করেছিল।

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে ১ হাজার ১৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই খাতে নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ঋণাত্মক ২ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা।

এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে স্থবিরতা থাকায় ব্যাংকগুলোতে উদ্বৃত্ত তারল্য জমছে। গত জুলাইয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হলেও তাতে প্রত্যাশিত সাড়া মিলছে না। ফলে ব্যাংকগুলো সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় অনেক ব্যাংকের কাছে উদ্বৃত্ত অর্থ পড়ে আছে। এই অর্থ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। তবে সরকারি ঋণের চাহিদা বাড়লে সুদহারের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ না বাড়িয়ে শুধু সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়ানো অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য ইতিবাচক নয়। ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত। ঋণের চাহিদা বাড়লে তারা বিনিয়োগ বাড়াতে পারবে।

চলতি অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে আগের অর্থবছরেও ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। শেষ পর্যন্ত সংশোধিত লক্ষ্যের চেয়েও ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি ঋণ নেয় সরকার।

ব্যাংকঋণের সঙ্গে বাড়ছে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের সুদ পরিশোধে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণের জোগান দেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব। তবে এই ঋণ কীভাবে পরিশোধ করা হবে, তা সরকারকেই ভাবতে হবে। রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ছে বলেও জানান তিনি।