চব্বিশের ৫ আগস্ট দুপুরে শেখ হাসিনার পতনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর জনরোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল সেই গণভবনে। বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় তছনছ হয়ে যায় পদচ্যুত স্বৈরশাসকের সুরম্য ও সুপরিসর বাসভবনটি। গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিকে ধারণ করতে সেখানে প্রতিষ্ঠিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর গতকাল ৬ আগস্ট বৃহস্পতিবার থেকে সবার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। প্রথম দিনই সেখানে কৌতূহলী দর্শনার্থীদের বেশ ভিড় জমেছিল।
জাদুঘর খোলার সময় বেলা ১১টা হলেও প্রথম দিন সকাল ৮টা থেকে দর্শনার্থীরা লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের কেউ এসেছিলেন শিশু-কিশোর সন্তানকে অভ্যুত্থান সম্পর্কে জানাতে। আন্দোলনে শহীদ বা আহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা আসেন সন্তানকে রাষ্ট্র কীভাবে সম্মানিত করেছে, তা দেখতে। এ ছাড়া জুলাইয়ের আন্দোলনে মাঠে থাকা অনেকে এসে আবার মুখোমুখি হয়েছেন সে সময়ের আগুনঝরা দিনগুলোর স্মৃতির সঙ্গে।
জাদুঘরের প্রবেশমুখে কথা হয় নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা হাসান আলীর সঙ্গে। তাঁর ছেলে সজল মিয়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিক্ষোভের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর অদূরে চিটাগাং রোডে মারা যান। হাসান আলী বলেন, ‘বাসা থেকে শহীদ ছেলের স্মৃতিমাখা কিছু সামগ্রী নিয়ে আসা হয়েছে। সেগুলো কোথায় কীভাবে রাখা হয়েছে, তা দেখার জন্য এসেছি।’
জাদুঘরের সামনে বানানো হয়েছে প্রতীকী গণকবর। এর সীমানা প্রাচীরের ওপরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ এবং তার আগেও আওয়ামী লীগের ক্ষমতা থাকাকালীন বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, শাপলা চত্বর ও পিলখানার ঘটনায় শহীদ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৪ হাজারের বেশি মানুষের নাম খোদাই করা হয়েছে। জাদুঘরের চারপাশে স্থাপন করা হয়েছে পিলখানার ঘটনা ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার কিছু প্রতীকে পরিণত ছবি এবং গুম করে ফেলা ব্যক্তিদের ভাস্কর্য।
প্রতীকী কবরের দক্ষিণ পাশে একতলা ভবনে তৈরি করা হয়েছে ‘আয়না ঘর’-এর রেপ্লিকা। সেখানে আটক ব্যক্তিদের বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার স্টিলের চেয়ার, নির্যাতনে ব্যবহৃত সরঞ্জামের পাশাপাশি গুমের শিকার ব্যক্তিদের আটক রাখার জায়গার প্রতিরূপ দেখানো হয়েছে। দর্শনার্থীদের বেশ ভিড় ছিল সেখানে। বেসরকারি চাকরিজীবী ইমরান আহমেদ বলেন, ‘আয়না ঘর দুনিয়ার জাহান্নাম। আমরা একটুক্ষণের জন্য দেখতে এসেই গরমে ঘামছি। যাঁরা মাসের পর মাস, বছরের পর বছর সেখানে বন্দী ছিলেন, তাঁরা কী কষ্টে দিন কাটিয়েছেন, তা ভাবতেও কষ্ট হয়।’
জাদুঘরের মূল ভবনের নিচতলার বিভিন্ন কক্ষে জুলাই আন্দোলনের ভিডিও ও স্থিরচিত্র, ৫ আগস্ট গণভবনে ছাত্র-জনতার অবস্থানের ভিডিও চিত্র, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার একাধিক ব্যক্তির ছবিসহ ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া নিচতলার একাধিক কক্ষে রাখা হয়েছে পিলখানার শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত পোশাকসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র।
নিচতলার ব্যাংকুয়েট হলের দেয়ালজুড়ে স্ক্রিনে চলছিল গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের নিয়ে তৈরি প্রামাণ্যচিত্র।
গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে যেসব অংশীজন রাজপথে ছিলেন, তাঁদের কার্যকলাপের ছবি আছে নিচতলায়। এর সিংহভাগ জুড়েই দেখা যায় বিএনপি ও তাদের জোটভুক্ত দলের নেতাদের ছবি। আছে গুমের শিকার জামায়াতের বর্তমান এমপি ব্যারিস্টার আরমানের ছবি। দোতলার বিভিন্ন কক্ষে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের ব্যবহৃত পোশাক, স্কুলব্যাগ, জুতা, আইডি কার্ড, মোবাইল ফোন, ক্রিকেট ব্যাটসহ নানান জিনিসপত্র রাখা হয়েছে। এ তলায়ও আছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের কার্যক্রমের ছবি। দোতলায় ভিডিও ও স্থিরচিত্র প্রদর্শনীর কক্ষে কথা হয় গৃহিণী ফাতেমা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘জাদুঘরে এসে অনেক কিছুই জীবন্ত মনে হচ্ছে। একটা মানুষ (শেখ হাসিনা) পুরো দেশটা শেষ করে দিয়েছে। দ্রুত তাঁর বিচার হওয়া উচিত।’