নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম কোনোভাবেই বন্ধ না করে তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে টেকসইভাবে পরিচালনার দাবি জানিয়েছে নাগরিক সংগঠনগুলো। একই সঙ্গে নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ৭ দফা সুপারিশও উপস্থাপন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানায় কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পুওর (কাপ)। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নগর দরিদ্র বস্তিবাসীদের ফেডারেশন (বিওএসসি) এবং পথবাসী, রূপড়িবাসী ও পথবাসীদের ফেডারেশন-সেফ হেল্প গ্রুপ নেটওয়ার্ক।
সংবাদ সম্মেলনের মূল প্রবন্ধে বলা হয়, সংবিধানের ১৫ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলেও স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মূলধারার সরকারি ব্যবস্থার আওতায় আসেনি। এর ফলে বিশেষ করে নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্যসেবার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বক্তারা বলেন, ১৯৯০ সাল থেকে নগর স্বাস্থ্যসেবা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আওতায় আনার দাবি জানিয়ে আসছেন বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা। পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় এনজিওদের মাধ্যমে পরিচালিত নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হওয়ায় লাখো মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন হোসনে আরা বেগম রাফেজা। সঞ্চালনা করেন কাপের নির্বাহী পরিচালক খোন্দকার রেবেকা সান ইয়াত। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিওএসসি ইয়ুথ গ্রুপের ফোকাল পারসন হেনা আক্তার রুপা।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন, জনগণের স্বাস্থ্য আন্দোলন বাংলাদেশের সমন্বয়কারী আমিনুর রসুল, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ এবং বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক ফোরামের খায়রুজ্জমান কমল।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে সবার জন্য প্রাথমিক ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একটি সরকারি কাঠামো থাকলেও নগর এলাকায় কার্যত এমন কোনো কাঠামো নেই। বড় হাসপাতালের বহির্বিভাগের সেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প হিসেবে দেখা যায় না।
আমিনুর রসুল বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশ। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, কার্যকর বিনিয়োগের মাধ্যমে নগর স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখতে হবে। অন্যথায় সরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে।
মূল প্রবন্ধে রেবেকা সান ইয়াত জানান, বর্তমানে দেশের ১২টি সিটি কর্পোরেশন ও ২১টি পৌরসভায় প্রকল্পের আওতায় ৪৫টি নগর মাতৃসদন এবং ১৬৭টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে ১৫টি অংশীদার এনজিওর ৩ হাজার ৪৭২ জন জনবল প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন।
রেবেকা সান বলেন, এসব কেন্দ্রে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান, কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও কোভিড-১৯ টিকাসহ ১৬ টির বেশি সেবা দেওয়া হচ্ছে। আগে নগর অতি দরিদ্রদের জন্য রেড কার্ডের মাধ্যমে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হলেও বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে।
সংগঠনগুলোর দাবি, নগর স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখতে বর্তমান এনজিওগুলোর সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অংশীদারত্বে কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের জন্য পুনরায় বিনামূল্যে রেড কার্ড চালু, স্বাস্থ্যসেবায় পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, প্রশিক্ষিত জনবল ধরে রাখা, ওয়ার্ডভিত্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র সম্প্রসারণ, শতভাগ নগরবাসীর দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং নগরবাসীর জন্য ‘হেলথ স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর দাবি জানানো হয়।