পৃথিবীর কোনো দেশে ‘পুলিশিং’ করে বাড়িঘর তৈরি করা সম্ভব না বলে মন্তব্য করেছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম।
আজ শনিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা) আয়োজিত ‘ডুরা সংলাপ: ভূমিকম্প ঝুঁকিতে দেশ: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় রাজউক চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন।
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, বিল্ডিং নির্মাণে প্ল্যান বা ডিজাইন তো আপনাদের থেকেই আসে, রাজউক শুধু অনুমোদন দেয়। পৃথিবীর কোনো দেশে তো পুলিশিং করে বাড়িঘর তৈরি করা সম্ভব না।
রিয়াজুল ইসলাম বলেন, একটা বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ কাটতে গেলে তারা আবার চুরি করে লাগায়, কোর্টে যায়। তাহলে একটা বাড়ির পেছনে কি আমাকে একজন করে ইন্সপেক্টর লাগিয়ে রাখতে হবে? এত লক্ষ ইন্সপেক্টর আমি কোথায় পাব?
ভবন নির্মাণে নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে রাজউকের ব্যবস্থা নেওয়ারও সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে রাজউকের দুর্বল উপস্থিতি রয়েছে। তবে এই দুর্বল উপস্থিতি দিয়ে যে কাজ শুরু করতে পেরেছি, এটাই আমার কাছে বিরাট অর্জন।
রিয়াজুল ইসলাম বলেন, পরিকল্পিত নগরায়ণ বা আবাসন নিয়ে রাজউক কাজ করে। শুরু থেকেই এই সেক্টরের অবস্থা এমন। আমি কাউকে দোষারোপ করতে চাই না। হয়তো কোনো একসময় অনিয়ম বেশি হয়েছে। তবে ধারাবাহিকভাবেই আজকের এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘একসময় শুধু আর্কিটেকচারাল প্ল্যান দিয়েই বিল্ডিং হয়ে যেত। ফায়ার সেফটি, ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল বা সিভিল স্ট্রাকচারাল ড্রয়িং লাগত না। এই পরিস্থিতিই তখন ছিল। কিন্তু এখন সেই ত্রুটিগুলো অপসারণ করার বা সংস্কারের দায়িত্ব আমাদের ওপর এসেছে।’
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক ভবন রয়েছে। এসব ভবনের ঝুঁকি একসঙ্গে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। তাই ধাপে ধাপে র্যাপিড ভিজ্যুয়াল অ্যাসেসমেন্ট, প্রিলিমিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট এবং ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ভূমিকম্প মোকাবিলায় রাজউকের সক্ষমতা বাড়াতে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে শুধু রাজউককে দায়ী না করে সিটি করপোরেশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
রিয়াজুল ইসলাম বলেন, যেকোনো জায়গায় জলাশয় ভরাট করে পাইলিং তুলে বিল্ডিং করে ফেললেই হবে না। পর্যাপ্ত নিয়মকানুন মেনেই বিল্ডিং নির্মাণ করলে ভূমিকম্প মোকাবিলা সহজ হবে। আর এই সব দেখে রাখাই রাজউকের কাজ। তবে ভূমিকম্প পরবর্তী রাজউকের আসলে আর কিছু করার থাকে না।
আগামীতে রাজউক ২৮০০ জনবলের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করবে জানিয়ে তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার যে ভূমিকম্প হলো, জাপানে যে এত বড় বড় ভূমিকম্প হয়, তারা কীভাবে মোকাবিলা করে। তাদের প্লানিং সিস্টেমটা ভালো। আমাদের দেশে সমস্যা হচ্ছে সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন।
রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, প্রকৌশলী ও তদারকি সংস্থাগুলোকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। দেশের স্বার্থ ও জনগণের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ডেভেলপারদের সহযোগিতা করতে হবে। অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ভবনের নকশা ও নির্মাণ নিশ্চিত করা গেলে টেকসই ও নিরাপদ ভবন নির্মাণ সম্ভব।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি শুধু ভবনের নকশা বা নির্মাণ মানের ওপর নির্ভর করে না; ভবনটি কোথায় এবং কী ধরনের মাটির ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্বল ও জলাভূমি এলাকায় অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, দুর্বল মাটির ওপর ভবন নির্মাণ বন্ধে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভবনের নকশা ও নির্মাণ তদারকির পাশাপাশি নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
ডুয়ার সভাপতি শাহজাহান মোল্লার সভাপতিত্ব ও সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী হাসান আনসারী।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক সালেহ উদ্দিন ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল।