বঙ্গোপসাগরে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত না হওয়ায় দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস-সংকটের সুরাহা হয়নি। মেরামতকাজ শুরু হলেও টার্মিনালটি কবে চালু হবে, তা নিশ্চিত করে জানাতে পারেনি পেট্রোবাংলা বা জ্বালানি মন্ত্রণালয়। ফলে গ্যাসের এই তীব্র সংকট শিগগির কাটছে না। জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এফএসআরইউ দ্রুত সচল করা না গেলে গ্যাসের এই সংকট আরও কয়েক দিন চলবে।
এদিকে দৈনিক ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী গ্যাসের সরবরাহ গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নেমে এসেছে ২ হাজার ২৬৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। সরবরাহের এই সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার আবাসিক গ্রাহক, সিএনজিচালিত যানবাহনের মালিক-চালকেরা এবং শিল্পকারখানার মালিকেরা। গতকাল শনিবারও দিনের বেশির ভাগ সময় বাসায় চুলা জ্বলেনি। সিএনজি স্টেশনে গ্যাসের জন্য দিনরাত যানবাহনের দীর্ঘ অপেক্ষা দেখা গেছে। গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে শিল্পকারখানায়।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, এফএসআরইউ (সাগরে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) পুরোপুরি মেরামত হতে আর কত সময় লাগবে, সেটি বলার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। বিদেশি প্রকৌশলীরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেলে তা জানানো হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমান তীব্র গ্যাস-সংকট তৈরি হয়েছে মূলত গত মঙ্গলবার সাগরে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে ছোট একটি অগ্নিকাণ্ডের কারণে। অগ্নিকাণ্ডের পর এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ওই টার্মিনালের কার্যক্রম নিরাপত্তার স্বার্থে প্রকৌশলীরা জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করে দেন। ওই সময় টার্মিনালে নোঙর করার অপেক্ষমাণ একটি এলএনজিবাহী জাহাজ নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
টার্মিনালটি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আরপিজিসিএলের এক কর্মকর্তা গতকাল জানান, টার্মিনাল অপারেটর এক্সিলারেট এনার্জি ইতিমধ্যে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের বাংলাদেশে এনেছে। শুক্রবার বিকেল থেকে তাঁরা টার্মিনালের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মেরামতের কাজ শুরু করেছেন। তবে কবে নাগাদ টার্মিনালটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত করে কিছু জানাতে পারেননি।
দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই চাহিদার বিপরীতে এত দিন বিভিন্ন গ্যাসকূপ থেকে উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে পাওয়া যাচ্ছিল দৈনিক ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে সাগরে দুটি ভাসমান টার্মিনাল হয়ে দৈনিক ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসও ছিল। কিন্তু মঙ্গলবার একটি টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডের পর বন্ধ করে দেওয়ায় এই সক্ষমতা অর্ধেকে নেমেছে।
পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই টার্মিনাল বন্ধের কারণে দৈনিক ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমেছে। ওই টার্মিনালে এলএনজি পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে মোট সরবরাহ নেমে এসেছে ২ হাজার ২৬৫ মিলিয়ন ঘনফুটে।
পেট্রোবাংলার দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে কারিগরি ত্রুটির কারণে শুক্রবারের গ্যাস সরবরাহের দৈনিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি জানতে গতকাল ফোন করা হলে আরপিজিসিএল কিংবা পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল একাধিক ব্যক্তি তা ধরেননি। তবে বিকেলে পেট্রোবাংলার এক হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় বলা হয়, এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউর কারিগরি ত্রুটি মেরামত শেষে চালু করার জন্য দেশি ও বিদেশি টেকনিক্যাল টিম নিরলসভাবে কাজ করছে। যত দ্রুত সম্ভব কার্যক্রম শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এ বিষয়ে কোনো আপডেট থাকলে পরবর্তী সময়ে জানানো হবে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গতকাল গিয়ে এবং বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দিনের বেশির ভাগ সময় চুলা জ্বলছে না। মধ্যরাতে কিছু সময়ের জন্য গ্যাস এলেও ভোরের পর থেকে চাপ কমে যাচ্ছে অথবা সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে রান্না মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনে খাচ্ছে। পাইপলাইনের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল অনেক ছোট হোটেলও পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে রান্না করতে পারছে না। অনেক হোটেলে রান্নার জন্য লাকড়ি ও এলপি গ্যাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মগবাজার, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বনশ্রী, আরামবাগ, কাজলা, যাত্রাবাড়ী, মালিবাগ, পরীবাগসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস না থাকায় রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবারে গভীর রাতে রান্না হচ্ছে। অনেকে বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করলেও বিদ্যুৎ বিল বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন।
রাজধানী এবং আশপাশের এলাকায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছে না সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন। অনেক মালিক সিএনজি না পেয়ে অতিরিক্ত খরচে জ্বালানি তেলে গাড়ি চালাচ্ছেন। তবে সিএনজিনির্ভর যানের চালকেরা গ্যাসের ভোগান্তিতে গাড়ি চালানো কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
কারওয়ান বাজার এলাকায় শুক্রবার রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক জোবায়ের বলেন, ঢাকার কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে রাতে অল্প চাপের গ্যাস পাওয়া গেলেও অধিকাংশ স্টেশন প্রায় বন্ধের মতো অবস্থা। একবার গ্যাস নিতে দু-তিন ঘণ্টা সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে তিনি মালিকের জমার টাকা তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন। নিজের খরচ তোলা তো দূরের কথা।
একই রাতে মগবাজার মোড়ে অনুদীপ সিএনজি-এলপিজি স্টেশনে দেখা যায়, গ্যাস নিতে অপেক্ষায় থাকা যানবাহনের সারি হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল ছাড়িয়ে নেভি হাউস পর্যন্ত গেছে। সেখানে অপেক্ষমাণ কয়েকজন গাড়িচালক জানান, তাঁরা রাইড শেয়ারিংয়ে যাত্রী পরিবহন করেন। এতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় আয় কমে যাচ্ছে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে লোকসান হচ্ছে।
আবদুল্লাহপুরের আরএসআর সিএনজি ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী রেজাবুদ্দৌজা চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দিনের বেলায় কোনো গ্যাস আসে না। ফলে গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে থাকলেও আমাদের কিছু করার থাকে না। রাতের দিকে সামান্য গ্যাস পাওয়া যায়। সেটা দিয়ে যতটুকু সম্ভব গ্রাহকদের চাহিদা মেটানো হয়।’
তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের সূত্র জানায়, গ্যাস-সংকটের কারণে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের বিভিন্ন কারখানার বয়লার অচল হয়ে পড়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে সময়মতো ক্রয়াদেশ সরবরাহ নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিকেএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান আজকের পত্রিকাকে বলেন, গ্যাস না থাকায় অনেক কারখানা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। বসিয়ে বসিয়ে শ্রমিকদের বেতন দিতে হবে, বিদ্যুৎ বিল দিতে হচ্ছে, কিন্তু উৎপাদন নেই। এই অবস্থায় ক্রেতাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করা যাবে না। উৎপাদনে দেরি হলে জাহাজের বদলে বাধ্য হয়ে হয়তো কার্গো উড়োজাহাজে পণ্য পাঠাতে হবে। এতে খরচ বেড়ে যাবে। মুনাফার সম্ভাবনা কমে যাবে, লোকসানও হতে পারে।