হোম > সারা দেশ > ঢাকা

মনোরেলের সম্ভাব্যতার সমীক্ষা হবে ১৪ রুটে

তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 

রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থায় নতুন মাধ্যম হিসেবে মনোরেল চালুর প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে সরকার। এখন কোন কোন রুটে মনোরেল করলে সবচেয়ে বেশি যাত্রীকে সেবা দেওয়া যাবে এবং অর্থনৈতিক ও কারিগরি দিক থেকে প্রকল্পটি বাস্তবসম্মত হবে, তা যাচাই করতে প্রাক্‌-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হবে। শুরুতে পাঁচটি রুট নিয়ে সমীক্ষার পরিকল্পনা থাকলেও এখন তা বাড়িয়ে ১৪টি করা হচ্ছে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এ উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রসঙ্গত, বিএনপির গত নির্বাচনের প্রতিশ্রুতিতে মেট্রোরেলের সঙ্গে সমন্বয় করে মনোরেল তৈরির পরিকল্পনার কথা ছিল।

গত ৩০ আগস্ট সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে মনোরেল নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পরামর্শক দল রুটের ওপর সমীক্ষা চালানোর বিষয়ে একটি উপস্থাপনা দেয়। বুয়েটের ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন (বিআরটিসি) মনোরেলের রুটের সম্ভাব্যতার সমীক্ষাটি করবে। শিগগির বুয়েটের সঙ্গে ডিটিসিএর এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। মন্ত্রণালয় ও ডিটিসিএ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সভায় উপস্থিত থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, মনোরেলের জন্য আগে নির্ধারিত পাঁচটি রুটের বাইরে আরও ৯টি রুটসহ মোট ১৪টি রুটে সমীক্ষা চালানোর জন্য বুয়েটের প্রস্তাব এতে উপস্থাপন করা হয়। মন্ত্রণালয় ও ডিটিসিএ এ প্রস্তাবের সঙ্গে একমত পোষণ করে। সভায় মত দেওয়া হয়, বেশি রুটে সমীক্ষা হলে সম্ভাব্য রুট নির্বাচন ও পরিকল্পনার জন্য আরও বেশি তথ্য পাওয়া যাবে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ডিটিসিএর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক অতিরিক্ত সচিব মো. মশিউর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ইউআরএসটিপিতে (সংশোধিত কৌশলগত হালনাগাদ পরিবহন পরিকল্পনা) প্রস্তাবিত পাঁচটি রুটের বাইরে আরও সম্ভাব্য রুট চিহ্নিত করতে বুয়েটকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি এখনো হয়নি। চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ১৪টি রুটসহ সমীক্ষার বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।’

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান সমীক্ষার কাজের সঙ্গে যুক্ত পরামর্শক দলের কার্যক্রম সমন্বয় করছেন। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, শহরের কিছু এলাকায় মেট্রোরেল তো দূরের কথা, প্রচলিত গণপরিবহনও নেওয়া সম্ভব নয়। ঢাকার অনেক সড়কের চরিত্র এমন যে সেখানে বড় ধরনের গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন। এসব এলাকার মানুষকে গণপরিবহনের আওতায় আনতে মনোরেলের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

অধ্যাপক হাদিউজ্জামান আরও বলেন, ‘মনোরেলকে শুধু মেট্রোরেলের ফিডার হিসেবে দেখলে হবে না। এটিকে একটি হাইব্রিড গণপরিবহনব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে, যা একই সঙ্গে নিজে যাত্রী পরিবহন করবে এবং মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে ফিডার হিসেবেও কাজ করতে পারবে। সমীক্ষার প্রস্তাবে বলা আছে; প্রয়োজনে আমরা বিভিন্ন রুটে সমীক্ষা করতে পারব। আর আমাদের নতুন রুট প্রস্তাবে মন্ত্রণালয় একমত হয়েছে।’

যে ১৪ রুটে নজর

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্র বলছে, মনোরেলের চূড়ান্ত রুট নির্ধারণের আগে সমীক্ষায় আপাতত নিচের রুটগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সম্ভাব্য সবচেয়ে দীর্ঘ রুট হচ্ছে এয়ারপোর্ট-আশকোনা-পূর্বাচল আবাসিক এলাকা-পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে-বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা-নদ্দা। ২৭ দশমিক ৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রুটে ২৩টি স্টেশন থাকতে পারে। দ্বিতীয় রুট মধ্য বাড্ডা-সাতারকুল-ইছাখালী-ভুলতা, দৈর্ঘ্য ১৪ দশমিক শূন্য ১ কিলোমিটার, স্টেশন ১৪টি।

তৃতীয় রুট মধুবাগ (হাতিরঝিল)-পশ্চিম রামপুরা-তিতাস রোড-মানিকদিয়া-কোনাপাড়া-রায়েরদিয়া। এর দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৯৮৬ কিলোমিটার এবং স্টেশন ১২টি। চতুর্থ রুট বছিলা ব্রিজ মোড়-হাজারীবাগ-মিটফোর্ড-সদরঘাট, দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৪৩২ কিলোমিটার এবং স্টেশন ৮টি।

পঞ্চম রুট জসীমউদ্‌দীন-উত্তরা সেন্টার-বিরুলিয়া-সাভার, দৈর্ঘ্য ১৫ দশমিক ১০৬ কিলোমিটার ও স্টেশন ১০টি। ষষ্ঠ রুট আগারগাঁও-শিশুমেলা-শ্যামলী-আদাবর-শেখেরটেক-বেড়িবাঁধ-ঢাকা উদ্যান, দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৪৬৪ কিলোমিটার ও স্টেশন ৯টি। সপ্তম রুট আবদুল্লাহপুর-উত্তরখান-তেরমুখ-উলুখোলা-এন ১০৫, দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৩৪৫ কিলোমিটার ও স্টেশন ১০টি।

অষ্টম রুট টিএসসি (ঢাবি)-নীলক্ষেত-হাজারীবাগ-কামরাঙ্গীরচর, দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৭৫৬ কিলোমিটার ও স্টেশন ৯টি। নবম রুট কমলাপুর-বাসাবো-মাদারটেক-নন্দীপাড়া-শেখের জায়গা-থুলথুলিয়া বাজার-পূর্বগ্রাম, দৈর্ঘ্য ১০ দশমিক ৩৫৫ কিলোমিটার ও স্টেশন ১১টি।

দশম রুট আগারগাঁও (বাংলাদেশ বেতার)-পীরেরবাগ-মিরপুর-২-রূপনগর-দুয়ারিপাড়া-আলুবদী, দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ৯৩৯ কিলোমিটার ও স্টেশন ১০টি। একাদশ রুট এয়ারপোর্ট-দক্ষিণখান, দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ৬৯১ কিলোমিটার ও স্টেশন ৯টি।

দ্বাদশ রুট কমলাপুর-মুগদা-মান্ডা-পূর্বগ্রাম-ইছাখালী-রূপগঞ্জ-পিতলগঞ্জ, দৈর্ঘ্য ১৮ দশমিক ৭৩৪ কিলোমিটার ও স্টেশন ১৯টি। ত্রয়োদশ রুট পল্টন-গুলিস্তান-নয়াবাজার-জনসন রোড-সদরঘাট-ফরাশগঞ্জ, দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার ও স্টেশন ৭টি। আর চতুর্দশ রুট টিএসসি-বকশীবাজার-চকবাজার-সোয়ারীঘাট-কামরাঙ্গীরচর, দৈর্ঘ্য ৪ দশমিক ৭৭২ কিলোমিটার ও স্টেশন ৮টি।

সমীক্ষার ভিত্তিতে এসব রুট ও স্টেশনের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসতে পারে।

কর্মকর্তারা বলেছেন, ১৪টি রুটকে যাত্রীসংখ্যা, সড়কের বৈশিষ্ট্য, ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা, স্থাপনা ভাঙার সম্ভাবনা এবং বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জসহ বিভিন্ন মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে রুটগুলোর একটি ক্রম তৈরি করা হবে। সেখান থেকে আগে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দুটি রুট সরকারের কাছে সুপারিশ করা হবে।

মেট্রোর বিকল্প নয়

মেট্রোরেল দুটি সমান্তরাল রেলের পাতের ওপর দিয়ে চললেও মনোরেল ইস্পাত বা কংক্রিটের একটিমাত্র বিমের ওপর দিয়ে চলে। একক বিমের (রেল) ওপর দিয়ে চলে বলেই এর নাম মনোরেল। নগরের ঘিঞ্জি ও ভবনবহুল এলাকায় তুলনামূলকভাবে কম জায়গা ব্যবহার করে পিলারের ওপর মনোরেলের লাইন করা সম্ভব। মেট্রোরেলের তুলনায় এর নির্মাণ ব্যয়ও কম হতে পারে। বাঁকযুক্ত পথে চলাচলের ক্ষেত্রেও মনোরেলের কিছু সুবিধা রয়েছে। তবে এতে মেট্রোরেলের তুলনায় যাত্রী পরিবহন করা যায় কম।

আগের প্রস্তাবিত পাঁচটি মনোরেল রুট ছিল বিমানবন্দর-জলসিঁড়ি-পূর্বাচল, বিমানবন্দর-সাভার, মোহাম্মদপুর-পোস্তগোলা, মধ্য বাড্ডা-ভুলতা এবং রামপুরা-ডেমরা। এসব রুটের কয়েকটি মেট্রোরেলের প্রস্তাবিত নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমান্তরাল হওয়ায় নতুন করে রুট বাছাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

সমীক্ষার সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেট্রোরেলের সঙ্গে সমান্তরালভাবে মনোরেল চালু করা হলে একই যাত্রীর জন্য দুই ধরনের গণপরিবহনের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। তাই মনোরেলকে মেট্রোরেলের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং মেট্রোরেলের বাইরে থাকা এলাকার জন্য পৃথক গণপরিবহনব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে যেখানে সম্ভব, সেখানে মেট্রোরেল স্টেশনের সঙ্গে সংযোগ রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকবে।

অধ্যাপক হাদিউজ্জামানও বলেন, ‘ঢাকার গণপরিবহনের ব্যাকবোন (মূল ভিত্তি) হিসেবে মেট্রোরেলকেই দেখতে হবে। মনোরেলকে এর বিকল্প হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ঢাকায় নাগরিকদের যে মাত্রায় যাতায়াতের চাহিদা রয়েছে, সেখানে মেট্রোর বিকল্প শুধু মেট্রোরেলই।’

ছয় মাসে সমীক্ষা

ডিটিসিএ সূত্র জানায়, সমীক্ষায় প্রতিটি রুটের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার পাশাপাশি সম্ভাব্য যাত্রীসংখ্যা, নির্মাণ ব্যয়, বাস্তবায়ন কৌশল এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। সম্ভাব্য রুট চিহ্নিত করার পাশাপাশি প্রকল্পের একটি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করবে বুয়েট। পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্য মডেলও তৈরি করা হবে। এ সমীক্ষায় ৭-৮ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

ডিটিসিএর পরিকল্পনা অনুযায়ী, মনোরেলের রুট নির্ধারণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা জনবহুল এলাকাকে। পুরান ঢাকা, মোহাম্মদপুর, রামপুরা, ডেমরা, পূর্বাচল, ভুলতা ও সাভারের মতো এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার সম্ভাবনাও সমীক্ষায় যাচাই করা হবে।

সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত কোন দুটি রুটে মনোরেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করবে সরকার। অর্থাৎ ১৪টি রুটের এই সমীক্ষা মূলত রাজধানীতে মনোরেলের ভবিষ্যৎ নেটওয়ার্কের প্রাথমিক বাছাইপর্ব।