হোম > সারা দেশ > ঢাকা

বিভিন্ন স্থানে নাশকতার চেষ্টা

শিল্পের কথা বলে বিস্ফোরক কেনে নব্য জেএমবি জঙ্গিরা

আমানুর রহমান রনি, ঢাকা

ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক নাশকতা তৎপরতায় আলোচিত নব্য জেএমবির সদস্যরা শিল্পকারখানায় ব্যবহারের কথা বলে পুরান ঢাকার বিভিন্ন রাসায়নিকের (কেমিক্যাল) দোকান থেকে বিস্ফোরক দ্রব্য সংগ্রহ করেছিলেন। পরে এসব উপকরণ দিয়ে দূরনিয়ন্ত্রিত বোমা বা আইইডি তৈরি করেন তাঁরা। কম বিস্ফোরক ব্যবহার করে শক্তিশালী বোমা তৈরির প্রযুক্তির দিকে তাঁদের মনোযোগ বলে জানিয়েছে পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল টিম।

তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গত নয় মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া বোমা ও বিস্ফোরকগুলো ছিল উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন ও সূক্ষ্মভাবে তৈরি। এসব বোমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত গ্রুপ নব্য জেএমবির পুরোনো ও অভিজ্ঞ দল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে সংগঠনটির কয়েকজন সদস্য আবার সক্রিয় হয়েছেন। ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে তাঁরা নাশকতা ঘটানোর চেষ্টা করছেন।

পুলিশ জানায়, গত ১১ জুলাই সাভারের হেমায়েতপুরের ট্যানারি এলাকার একটি সড়ক থেকে নব্য জেএমবির সদস্য মো. ইমরান হোসেন আরিফকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। ইমরানের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই রাতেই সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ১১টি আইইডি, বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, জিহাদি বই ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

এর পরদিন সাভারের সাধাপুর এলাকা থেকে প্রেশারকুকারের ভেতরে স্থাপন করা একটি বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল টিম সেটি নিষ্ক্রিয় করার সময় বিকট শব্দ হয় এবং আকাশে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের দাবি, বোমাটি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। জনবহুল এলাকায় সেটির বিস্ফোরণ ঘটলে অনেক হতাহতের আশঙ্কা ছিল।

সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম বলেন, বোমাটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে নিষ্ক্রিয় করার সময় এলাকা কেঁপে ওঠে।

পুলিশের ভাষ্য, গ্রেপ্তার আরিফের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে। নব্য জেএমবির সদস্য নাজমুল ইসলাম মামুনের মাধ্যমে সংগঠনটিতে যুক্ত হন তিনি। মামুন ২০১৭ সালে পান্থপথের হোটেল ওলিও-তে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জামিনে বের হন এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে ওই মামলায় খালাস পান।

মামুন বোমা তৈরিতে দক্ষ হওয়ায় নব্য জেএমবির সদস্যদের কাছে ‘বোমারু মামুন’ নামে পরিচিত বলে পুলিশ জানিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্ধুকযুদ্ধে নিহত নব্য জেএমবির আরেক সদস্য মারজানের কাছ থেকে মামুন বোমা তৈরির কৌশল শিখেছিলেন বলেও দাবি তদন্তকারীদের।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে মামুন সাভার-আশুলিয়া এলাকায় একটি ছোট গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে আরিফ ছাড়াও রাকিব, আব্বাস আলী, বাপ্পীসহ আরও কয়েকজন রয়েছেন। তাঁদের অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেন ‘কামাল হোসেন ডাক্তার’ নামে এক ব্যক্তি, যিনি একটি ফার্মেসির মালিক। সাভারের ঘটনায় হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাঁদের সবাইকে আসামি করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, নব্য জেএমপির ওই গ্রুপটি বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারের কথা বলে বিস্ফোরক সংগ্রহ করে। পরে সেগুলো দিয়ে আইইডি তৈরি করে দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন সামগ্রীর ভেতরে তা স্থাপন করা হয়। এসব বোমা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ অথবা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে বিস্ফোরণের জন্য প্রস্তুত করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

নব্য জেএমবির আরও তিনটি গ্রুপ

পুলিশ বলছে, মামুনের গ্রুপ ছাড়াও নব্য জেএমবির আরও তিনটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে বাগেরহাটের শেখ আল-আমিন ওরফে রাজীব ইসলাম একটি গ্রুপ পরিচালনা করেন।

গত ২৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে আল-আমিনের ভাড়াবাড়ির মাদ্রাসায় বিস্ফোরণে নারী, শিশুসহ চারজন আহত হয়। বিস্ফোরণের পর আল-আমিন পালিয়ে গেলেও গত ২৫ ফেব্রুয়ারি কদমতলী থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)। ওই মাদ্রাসা থেকে প্রায় ৪০০ কেজি বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। ওই ঘটনায় ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ওই ঘটনার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক সাহিদুর রহমান বলেন, ফরেনসিক প্রতিবেদন ও আরও কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের পর মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

নব্য জেএমবির আরেকটি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন শাহ আমানত সাবির। সিটিটিসির দাবি, যাত্রাবাড়ীতে ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ নামে মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের আড়ালে সদস্য সংগ্রহ ও উগ্রবাদী কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। গত ৫ জুলাই অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাহসীন ইসলাম ওরফে সুলতান ওরফে মুসান্নাকে যশোর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ ঘটনায় ১৬ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। ১৮ জুলাই শাহ আমানত সাবির ও তাহসীন ইসলাম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিটের দাবি, গত ৭ মার্চ কুমিল্লার দক্ষিণ ঠাকুরপাড়ার একটি শিবমন্দিরে বোমা হামলার নেপথ্যেও নব্য জেএমবির একটি গ্রুপ জড়িত। চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জকেন্দ্রিক এই গ্রুপটি অমুসলিমদের সম্পদ লুটের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি। ডাকাতিকেও অর্থ সংগ্রহের উপায় হিসেবে তারা সমর্থন করে।

সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, নব্য জেএমবির গ্রুপগুলো পরস্পরের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত না জানলেও শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনায় একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাদের মূল কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে বিস্ফোরক সংগ্রহ, বোমা তৈরি ও অর্থ সংগ্রহ।

এসব ঘটনা তদন্ত করা কর্মকর্তারা বলছেন, নব্য জেএমবির সদস্যরা যে এলাকায় বাসা ভাড়া নেন, সেখানে মোবাইল ফোন ব্যবহার এড়িয়ে চলেন। অন্য এলাকায় গিয়ে মোবাইলে কথা বলেন এবং ফোন বন্ধ করে বাসার এলাকায় প্রবেশ করেন। বৈঠকের স্থানও তাঁরা আগে থেকে নির্ধারণ করে নেন।

সাভারের ঘটনা উল্লেখ করে সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, আরিফের বাসা ও গ্রেপ্তারের এলাকার কোথাও তাঁর মোবাইলের লোকেশন পাওয়া যায়নি। তাঁর মোবাইল লোকেশন সব সময় অন্য এলাকায় দেখা গেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের পর থেকেই এসব ঘটনার নেপথ্যের কারিগরদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। সব ঘটনা আমাদের তদন্তাধীন রয়েছে।’