ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান ও গলা (ইএনটি) বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. আসাদুর রহমানের ওপর হামলার পর তাঁকে ফের হুমকি দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। এর আগে গত ৬ আগস্ট হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে তাঁর কাছে ১৫ হাজার ডলার চাঁদা দাবি করেছিল সন্ত্রাসীরা। ১৪ আগস্টের মধ্যে ওই অর্থ পরিশোধের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে চাঁদা না দেওয়ায় গত ১৭ আগস্ট রাতে রাজধানীর শান্তিনগরে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়। পুলিশ এই ঘটনায় জীবন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করলেও হামলায় অংশ নেওয়া অপরদের এখনো ধরতে পারেনি।
বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অধ্যাপক আসাদুর রহমানের দুই চোখে রক্ত জমাট বেঁধেছে। তাঁর চোখের কর্নিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আহত চিকিৎসক আজকের পত্রিকাকে বলেন, গত ৬ আগস্ট তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপে একটি নম্বর থেকে ওই হুমকির বার্তা আসে। তখন তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। কোনো প্রতারক চক্র হয়তো তাঁকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে—এমনটি ভেবে তিনি আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেননি। তবে হামলার পর তিনি বুঝতে পারেন, হুমকির সঙ্গে হামলার যোগসূত্র থাকতে পারে।
আসাদুর রহমান জানান, ১৪ আগস্টের মধ্যে চাঁদা দেওয়ার কথা বলা হলেও তিনি তা দেননি, সন্ত্রাসীদের বার্তার পাত্তাও দেননি। এরপর ১৭ আগস্ট রাতে শান্তিনগরের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে তাঁর ওপর হামলা হয়। হামলার প্রায় এক ঘণ্টা পর সন্ত্রাসীরা তাঁকে আবার বার্তা পাঠিয়ে জানতে চায়, ‘এখন কেমন লাগে?’ পরদিন ১৮ আগস্ট ফের হুমকি দিয়ে বলা হয়, ‘তুমি কি আমাদের সঙ্গে আরও লাগতে আসবা? তুমি কোথায় যাবা, যার কাছেই যাবা তাদের সঙ্গেই আমাদের যোগাযোগ আছে।’
চিকিৎসক জানান, এসব হুমকি ‘ডেভিড ইমন’ নামে দেওয়া হয়েছে। এতে তিনি এখন ভীতসন্ত্রস্ত। তাঁর ধারণা, এর পেছনে কোনো বড় গ্যাং থাকতে পারে।
এর আগে ৬ আগস্ট ইংরেজিতে পাঠানো ওই বার্তায় বলা হয়, ১৪ আগস্টের মধ্যে তাদের সংগঠনকে ১৫ হাজার ডলার নগদ দিতে হবে। বার্তায় চিকিৎসককে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অসৎ বলে অভিযোগ করা হয়। পাশাপাশি আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়েও নানা অভিযোগ তোলা হয়।
বার্তায় আরও বলা হয়, তিনি চাইলে সরকারের যেকোনো সংস্থা, পুলিশ বা সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। তবে তারা তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের স্থায়ী নিরাপত্তা দিতে পারবে না বলেও হুমকি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা কথিত দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করার হুমকিও দেওয়া হয়।
চাঁদা দেওয়ার নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পর ১৭ আগস্ট রাতে শান্তিনগরের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে অধ্যাপক আসাদুর রহমানের ওপর হামলা হয়। ওই দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে চেম্বার শেষে সিএনজি অটোরিকশায় করে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরছিলেন তিনি।
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্মী রাশেদুল ইসলাম জানান, শান্তিনগরে পপুলারের তিন নম্বর ভবনে ব্যক্তিগত চেম্বার শেষে অধ্যাপক আসাদুর সিএনজি অটোরিকশায় ওঠেন। এ সময় ৪-৫ জন ব্যক্তি অটোরিকশাটি থামিয়ে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালায়। এতে তাঁর মাথা, চোখ ও নাকে আঘাত লাগে।
হামলার সময় এক হামলাকারীকে পথচারীরা ধাওয়া করে ধরে পুলিশে দেয়। পরে তাঁকে অধ্যাপক আসাদুর রহমানের করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম জীবন। ঢাকায় তাঁর বাসা ডেমরায়, গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর। তারা হামলা ৫ জন অংশ নেয়। পুলিশের ধারণা, এরা কোনো একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের মাঠকর্মী। তারা সবাই সদ্য নাম ব্যবহার করেছে। জীবনের আরেক নাম একটি নাম আদিল। তাঁর এনআইডি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। হামলায় অংশ নেওয়া অপর চারজনের ছদ্মনাম পাওয়া গেলেও তাদের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তফা কামাল খান জানান, অধ্যাপক আসাদুরের ওপর হামলার ঘটনায় তিনি নিজেই বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। ওই মামলায় জীবনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তাঁকে রিমান্ডে আনা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ডেভিড ইমনের নামে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, সেই ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী। সম্প্রতি তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা, তাঁর নাম ব্যবহার করে হয়তো অন্য কোনো গ্রুপ এই হুমকি দিয়েছে। এ ছাড়া ক্যাপ্টেন ইমন নামে মোহাম্মদপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী রয়েছে। তবে এরা কেউ এই হুমকি ও হামলার সঙ্গে জড়িত কিনা, তা খতিয়ে দেখবে পুলিশ।
এদিকে চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, অতীতে চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় যথাযথ বিচার না হওয়ায় বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। তিনি অধ্যাপক আসাদুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।