সেই কবে প্রখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষ আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’। নিভৃতে প্রেমিকাকে দেখা দিতে গিয়ে কবি মহানগরের বাহারি বিজ্ঞাপনের আড়ালে হারিয়ে গিয়ে সেই খেদোক্তি করেছিলেন। আর এখন ঢাকার রাজপথে বের হলে যে কারও মনে হতে পারে, গোটা শহরটারই মুখ যেন চাপা পড়েছে বিজ্ঞাপনের নিচে।
বৈদ্যুতিক খুঁটি, মেট্রোরেল কিংবা ফ্লাইওভারের প্রশস্ত পিলার, নিরীহ গাছের শরীর এবং নানা ধরনের ভবন —যেখানেই সম্ভব হয়েছে সেখানেই সাঁটানো বা টাঙানো হয়েছে নানা ধরনের পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট ইত্যাদি। দৃশ্যদূষণের মহোৎসব চলছে যেন।
পুরোনো পোস্টার না খুলেই তার ওপর নতুন পোস্টার লাগানোর ফলে অনেক জায়গায় তৈরি হয়েছে কাগজের পুরু স্তর। অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক সর্বত্র ছেয়ে গেছে রাজনৈতিক প্রচারণা, কোচিং সেন্টার, চাকরির প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ, আবাসন, নিত্যপণ্য, চিকিৎসালয়সহ হাজারো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রচারণায়। ‘পড়াইতে চাই’ আর ‘টু লেট’-এর মতো ক্ষুদ্র আকারের বিজ্ঞাপনের সংখ্যা হবে লাখ লাখ।
রাজধানীর শাহবাগ, ফার্মগেট, পুরানা পল্টন, রামপুরা, হাজারীবাগসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দৃষ্টিকটু, নিয়ন্ত্রণহীন বিজ্ঞাপনের এ রকম দৌরাত্ম্য দেখা গেছে। অনেক জায়গায় নিশ্চিতভাবে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য একই ধরনের অনেকগুলো পোস্টার সার বেঁধে লাগানো হয়েছে। পুরোনো পোস্টারের ওপর নতুন পোস্টার পড়তে পড়তে কোথাও কোথাও দেয়াল বা খুঁটির মূল অবয়বই আর চোখে পড়ে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টারগুলোর আশপাশের দেয়াল ও বৈদ্যুতিক খুঁটিতে পোস্টার-ব্যানার চোখে পড়ে সবচেয়ে বেশি। রামপুরা থেকে মালিবাগ পর্যন্ত বড় রাস্তায় থাকা প্রায় প্রতিটি বিদ্যুতের খুঁটিতে দেখা গেছে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং সেন্টার ইউসিসির পোস্টার। কয়েকটি খুঁটিতে রয়েছে স্কলার্সের পোস্টার। শাহবাগে মেট্রোরেলের পিলারে একসঙ্গে লাগানো হয়েছে ফোকাস কোচিং সেন্টারের বড় বড় পোস্টার। অন্যদিকে ফার্মগেটে ফুটওভারব্রিজ-সংলগ্ন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলারে দেখা গেছে উদ্ভাসের পোস্টার।
এ প্রতিবেদক ফার্মগেটে পিলারে লাগানো পোস্টারের ছবি তোলার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আল নোমান বলেন, কোচিং সেন্টারগুলো যেন প্রতিযোগিতা করে নিজেদের পোস্টার লাগিয়েছে। বর্তমানে পত্রিকা, টিভি ছাড়াও অনলাইনে প্রচারের এত ভালো সুযোগ থাকায় এভাবে সৌন্দর্যহানি করে দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার না লাগালেও পারত তারা।
যত্রতত্র পোস্টার লাগানোর বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কোনো কোচিং সেন্টার কর্তৃপক্ষই মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে একটি কোচিং সেন্টারের মার্কেটিং বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, নিয়ম মেনে বিজ্ঞাপন প্রচারের পর্যাপ্ত বিলবোর্ড না থাকায় এ রকম হচ্ছে।
দেয়াললিখন ও পোস্টার লাগানোর বিষয়ে আইন রয়েছে, তবে মানা হচ্ছে না। ‘দেয়াললিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২’ অনুযায়ী নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য কোথাও দেয়াললিখন বা পোস্টার লাগানোর সুযোগ নেই। আইনের ৬ ধারায় অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে।
এ ছাড়া গত বছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছিল, অনুমোদন ছাড়া সৌন্দর্য নষ্ট করে পোস্টার, ব্যানার ও দেয়াললিখন আইনত নিষিদ্ধ। দেয়াললিখন ও পোস্টার লাগানো নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২-এর ধারা ৩ ও ৪ অনুযায়ী এসব কর্মকাণ্ড অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
ঘোষণার পর বিভিন্ন সময়ে অভিযানও চালানো হয়েছে। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই একই জায়গায় আবার পোস্টার লাগানোর ঘটনা ঘটছে। ফলে একদিকে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা পোস্টার অপসারণ করছেন, অন্যদিকে নতুন করে চলছে পোস্টার লাগানোর কাজ।
ফার্মগেট এলাকার ব্যবসায়ী মো. রুবেল বলেন, এই শহরের সবচেয়ে বেশি পোস্টার-ফেস্টুন হচ্ছে এই ফার্মগেটে। এখানে এমন কোনো স্থান নেই, যেখানে এসব নেই। এতে এই এলাকার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে গেছে।
রামপুরার বাসিন্দা আহসান হাবিব রিয়াদের মতে, রাজধানীর দৃশ্যমান অবকাঠামোও নাগরিক সেবা ও চলাচলের অংশ। এসব জায়গা যখন ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক প্রচারণার মাধ্যম হয়ে ওঠে, তখন শহরের সামগ্রিক নান্দনিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা যেখানে অবৈধ পোস্টার-ফেস্টুন পাই, সরিয়ে ফেলি। তবে আজ সরালে কালই যদি লাগিয়ে ফেলে, তাহলে তো আমাদের কিছু করার নেই।...আপাতত পোস্টারের জন্য জরিমানা করা হচ্ছে না। ভবিষ্যতে জরিমানা করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
জাকির হোসেন আরও বলেন, ‘আমাদের পোস্টার লাগানোর নির্ধারিত বিলবোর্ডের সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। যেগুলো আছে, সেগুলোও ভাড়া দেওয়া হয়েছে।’
নগর-পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার উপকরণ নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়লে তা নগরের দৃশ্যমান পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরিস্থিতির উন্নতিতে নির্ধারিত বিলবোর্ডের সংখ্যা বাড়ানো, নিয়মিত নজরদারি, অননুমোদিত পোস্টার লাগানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য ও নগরবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, একটি শহরের কোথায় কী ধরনের পোস্টার বা ব্যানার থাকবে, তা সুনির্ধারিত থাকা দরকার। নির্ধারিত জায়গা না থাকায় যেখানে-সেখানে এসব লাগানো হচ্ছে। যত্রতত্র পোস্টার, ব্যানার লাগানোকে দৃশ্যদূষণের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকায় যেখানে-সেখানে পোস্টার লাগানোর অনিয়ন্ত্রিত প্রবণতা এখন এক মারাত্মক নাগরিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এটি নগরের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে গ্রাস করছে এবং নগরবাসীর মধ্যে মানসিক অস্বস্তি ও বিরক্তি তৈরি করছে।
আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, একটি আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন মেগাসিটি গড়ার ক্ষেত্রে এই সংস্কৃতি বড় অন্তরায়। ঢাকার পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় কঠোর তদারকি, ডিজিটাল প্রচারের ব্যবহার বৃদ্ধি, নাগরিক সচেতনতা এবং সর্বোপরি আইনের কার্যকর প্রয়োগ জরুরি।