জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী। আজ রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত ‘বর্তমান সরকারের চার মাস: প্রত্যাশা, অর্জন ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন।
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ অচিরেই সংবিধানিক সংকটে পড়বে, আদালতে বহু রিট হবে। এর অন্যতম কারণ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করা। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করার কারণে সরকার অন্য সংস্কারগুলোও করতে পারছে না। অথচ ক্ষমতাসীন দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বলেছিল।’
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করার পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দিলারা চৌধুরী আরও বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, সংসদ সংস্কার পরিষদের বিষয়টি সংবিধানে নেই। কিন্তু জনগণ গণভোটের মাধ্যমে সেই পরিষদ গঠনের ব্যাপারে তাদের মতামত দিয়েছে।’
তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘সংসদ সার্বভৌম’—বক্তব্যকেও ভুল বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘শুধু যুক্তরাজ্যে সংবিধান সার্বভৌম। কিন্তু তারাও ব্রেক্সিটের বিষয়ে গণভোট মেনে নিয়েছে। আমি মনে করি, সরকারকে অবশ্যই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া দেশের সার্বিক উন্নতি নিশ্চিত হবে না।’
শুধু আড়াই হাজার টাকার কার্ড দিলে কৃষকের কী উপকার হবে—এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘কৃষির আধুনিকায়ন করা হলে, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের উন্নত ব্যবস্থা গেলে কৃষক উপকৃত হবে। তা ছাড়া আমাদের বাজেট কত দিন এ ধরনের ভাতা দেওয়া এলাও করবে এটাও একটা বিষয়।’ এর মাধ্যমে অলস জাতি তৈরি হবে এবং এসব কার্ডের বিতরণে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে মানুষের বাক্-স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়েছিল, দুর্নীতির বিস্তার ঘটেছিল, এবং সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণ করা হয়েছে উল্লেখ করে বৈঠকে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘মূলত দলীয়করণের মাধ্যমে সেই সরকার টিকে থাকতে চেয়েছিল। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যই কতগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। কিন্তু আমরা আবার পুরোনো পথেই হাঁটছি। কিন্তু পুরোনো পথে হেঁটে নতুন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না।’
জুলাই সনদ সম্পর্কিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারের গড়িমসি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’—শীর্ষক বক্তব্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর সেই পরিকল্পনা দেখতে চাই। অতীতে যে দুঃসহ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল তা থেকে উত্তরণের জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা যেন প্রধানমন্ত্রী সেই পরিকল্পনায় তুলে ধরেন। আমি মনে করি, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই কতগুলো সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তিনটি অগ্রাধিকার—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনের কথা তুলে ধরেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচারে ধীর গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমরা চাই, এই বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হোক।’
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বিদ্যমান আইনের সঙ্গে আপাত সংগতিপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেন সুজন সম্পাদক। কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ আইনে ওয়ার্ডসভার বিধান রয়েছে, যার মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সরকারি সহায়তা স্কিমের উপকারভোগী চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে। সুতরাং, এ কার্ডগুলোকে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই করতে হলে আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার করার প্রয়োজন আছে কি না তা খতিয়ে দেখা আবশ্যক।’
বৈঠকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ওয়ারেসুল করীম বলেন, ‘সরকার মনে হচ্ছে কোনো পিআর ফার্ম এর হয়ে কাজ করছে। অর্থাৎ যে বিষয়গুলো জনগণের দৃশ্যমান হবে বেছে বেছে শুধু সে উদ্যোগগুলোই বাস্তবায়ন করছে। যেমন, ১০ হাজার মানুষকে কোনো একটি কার্ড দেওয়া হচ্ছে। অথচ দেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। দু হাজার বা পাঁচ হাজার টাকার কার্ড মানুষের জন্য কতটুকু ফলপ্রসূ হবে?’
এর পরিবর্তে কর্মসংস্থান বাড়ানো দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন-এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী, নাগরিক কোয়ালিশনের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক পরিচালক রফিকুল ইসলাম প্রমুখ।