ছিনতাইয়ের কবলে শিক্ষিকা নিহত
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারীর টানে অটোরিকশা থেকে পড়ে শিক্ষিকা রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. খোকন (৩৫) ও মো. রাজিব মাতুব্বর (৩৬)।
ডিবির দাবি, এই দুজনই রনজিলার ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। ঘটনার সময় রাজিব মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন এবং পেছনে বসে খোকন রনজিলার ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টান দেন।
আজ বুধবার রাজধানীর ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিবির প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে খোকন ও রাজিবকে শনাক্ত করা হয়েছে।
তবে একই ঘটনায় এর আগে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনকে নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট তৎকালীন র্যাব-২ রাকিব হোসেন, পনি গাজী ও সেড্রিক জুলিয়ানকে গ্রেপ্তার করেছিল। রাকিবকে ওই মোটরসাইকেলের মালিক এবং অপর দুজনকে তাঁর সহযোগী দাবি করেছিল র্যাব। রিমান্ড শেষে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।
র্যাবের নতুন নামে আসা এসআরবি-২-এর এক কর্মকর্তা বলেন, রাকিব, পনি ও সেড্রিককে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আইন অনুযায়ীই তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ডিবির পরবর্তী তদন্তে সহায়ক হয়েছে।
ডিবি বলছে, র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার ওই তিনজন রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত নন। তাঁদের সঙ্গে নতুন করে গ্রেপ্তার খোকন ও রাজীবেরও কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। ডিবির দাবি, তাঁরা দুটি পৃথক অপরাধী চক্রের সদস্য। র্যাব যে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছিল, সেটিও রনজিলাকে ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহৃত হয়নি।
গত ২৯ আগস্ট ভোরে চোখের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য স্বামী আবদুল মতিনের সঙ্গে অটোরিকশায় করে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের জাতীয় সংসদ ভবনের ১২ নম্বর গেটসংলগ্ন সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন রনজিলা পারভীন। এ সময় মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী তাঁর হাতে থাকা ব্যাগ ধরে টান দেন। তাঁদের টানে চলন্ত অটোরিকশা থেকে রাস্তায় পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান রনজিলা। প্রথমে তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
রনজিলা বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। এ ঘটনায় তাঁর স্বামী ৩০ আগস্ট শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন।
ডিবির প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা শুরু হয়। একপর্যায়ে ডিবির তেজগাঁও বিভাগ তাঁদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। পরে ঢাকা, সাভার ও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে খোকন ও রাজীবকে গ্রেপ্তার করা হয়। খোকনকে মিরপুরের মনিপুর পশ্চিমপাড়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিবির ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে খোকন ঘটনার সময় মোটরসাইকেলের পেছনে বসে রনজিলার ব্যাগ ধরে টান দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মিরপুর থানার বড়বাগ এলাকা থেকে রনজিলার ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। ব্যাগে তাঁর পোশাক, বাসের টিকিটের অংশ, চশমার বাক্স ও ওষুধ ছিল। পরে মিরপুর-১ এলাকা থেকে তাঁর মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়।
এরপর বিরুলিয়া এলাকা থেকে রাজীব মাতব্বরকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবির দাবি, ঘটনার সময় রাজীব মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। রাজীবের কাছ থেকে ৬২২টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানায় ডিবি।
ডিবি জানায়, রাজীবের বিরুদ্ধে অস্ত্র, দস্যুতা, চুরি, মারামারি ও দ্রুত বিচার আইনের মামলাসহ আটটি মামলা রয়েছে। খোকনের বিরুদ্ধে মাদকের তিনটি মামলা রয়েছে।
র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার তিনজনের বিষয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ ও পরবর্তী তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তাঁরা এ ঘটনায় জড়িত নন। সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় তাঁদের এ মামলা থেকে বাদ দেওয়া হবে। তবে অন্য কোনো মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া থাকলে তা চলবে।
ডিবির দাবি, ঘটনার সময় সিসিটিভি ফুটেজে মোটরসাইকেলে দুজনকে দেখা যায়। রাজীব চালকের আসনে এবং খোকন পেছনে ছিলেন। মোটরসাইকেলটি রাজীবের নিজের। এ ছাড়া খোকনের পরনের শার্ট, হাতঘড়ি ও মাথার ক্যাপও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানায় ডিবি।
র্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেল সম্পর্কে ডিবি প্রধান বলেন, সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে সেটি মিলিয়ে দেখার পর পার্থক্য পাওয়া যায়। ফুটেজে থাকা মোটরসাইকেলটির রং এবং র্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের রং ভিন্ন।
ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় রনজিলার স্বামী ছিনতাইকারীকে এক ঝলক দেখেছিলেন। পরে তাঁর দেওয়া বর্ণনার ভিত্তিতে পেছনে থাকা খোকনকে শনাক্ত করা হয়।
এদিকে র্যাবের নতুন নামে আসা এসআরবি-২-এর এক কর্মকর্তা বলেন, রাকিব, পনি ও সেড্রিককে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং আইন অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ডিবির পরবর্তী তদন্তে সহায়ক হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, র্যাব ও ডিবির মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। দুই বাহিনী নিজ নিজ জায়গা থেকে তদন্ত করেছে। নির্দোষ কেউ যাতে শাস্তি না পান, সেটিই তাঁদের উদ্দেশ্য। ডিবি যাঁদের গ্রেপ্তার করেছে, তাঁরাই প্রকৃত আসামি বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে; তবে তদন্ত শেষ হলেই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।