হোম > সারা দেশ > ঢাকা

বুড়িগঙ্গা-তুরাগে দূষণের ২২৪ উৎসমুখ শনাক্ত, ৫৫ শতাংশ শিল্পবর্জ্য

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

ঢাকায় বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যবসায়ী মহল ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা। ছবি: আজকের পত্রিকা

তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণে শিল্পবর্জ্যের উৎসমুখ বন্ধ, খাল-ড্রেনের বর্জ্য অপসারণ এবং নদীর তলায় জমে থাকা স্থায়ী বর্জ্য সরিয়ে এই দুই নদীকে নৌযান চলাচল তথা পর্যটন উপযোগী করতে চায় সরকার। সেই লক্ষ্যে ইতিমধ্যে এই দুই নদীর দূষণের ২২৪টি উৎসমুখ শনাক্ত করা হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার ঢাকায় বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যবসায়ী মহল এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

সভায় জানানো হয়, জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর দুই নদীর দূষণের জন্য দায়ী ৫৫ শতাংশ বর্জ্যই দুই পাড়ের শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে ফেলা হয়। দূষণে জর্জরিত এই দুই নদীর চেহারা বদলে দিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় সেল গঠন করা হচ্ছে। এই সেল সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে।

সভায় প্রকল্পের ধারণাপত্র তুলে ধরেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ আল মাকসুস। তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গা অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। নদীর পানিতে যেখানে প্রতি লিটারে ন্যূনতম ৫ মিলিগ্রাম দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকার কথা, সেখানে বুড়িগঙ্গায় আছে ১ দশমিক ৭০ থেকে ২ দশমিক ৬৮ মিলি।

জরিপের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দূষণের সবচেয়ে বড় উৎস শিল্পবর্জ্য। দুই নদীতে মোট দূষণের ৫৫ শতাংশ শিল্পবর্জ্য, রং, রাসায়নিক বর্জ্য ও ভারী ধাতু। অন্যদিকে ২৫ শতাংশ জৈববর্জ্য, রোগজীবাণু ও অ্যামোনিয়া। বুড়িগঙ্গার প্রধান দূষক ট্যানারি বর্জ্য, পয়োবর্জ্য, শিল্প ও বাজারের বর্জ্য, তেল, কালো গাদজাতীয় পদার্থ ইত্যাদি। তুরাগের প্রধান দূষক পয়োবর্জ্য, শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিক।

প্রতিবেদনে বুড়িগঙ্গায় ১৬৬টি বর্জ্য নিঃসরণের উৎসমুখ, তুরাগে ৫৮টিসহ মোট ২২৪টি উৎসমুখ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানই বড় অংশ।

প্রতিবেদনে নদীদূষণ বন্ধে বর্জ্যের উৎসমুখ বন্ধ করা, সব কারখানার উৎসভিত্তিক তালিকা তৈরি, ইটিপি বা তরল বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন ও ব্যবহারে বাধ্য করা, অনুমোদনহীন ড্রেন শনাক্ত করে বন্ধ করা, নিয়মিত টহল ও কারখানা পরিদর্শন এবং দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়।

সভায় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রাথমিকভাবে শিল্পদূষণ, দখলজনিত দূষণ ও নৌযানের দূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করা হবে। পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে পয়োবর্জ্যজনিত দূষণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগও চলছে।

সভায় বিজিএমইএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এনামুল হক খান বলেন, বুড়িগঙ্গায় শ্বাস নেওয়া যায় না। তুরাগের পানি নড়ে না, কাদার মতো হয়ে গেছে। দেশের কলকারখানায় ১ হাজার ৭৬০টি ইটিপি থাকলেও বেশির ভাগই বন্ধ থাকে।

বিকেএমইএর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট হোসেন মাহমুদ আগে প্রয়োজনীয় মাপকাঠি নির্ধারণ করে আলোচনা করে প্রকল্প শুরু করলে সবার জন্য সুবিধা হবে বলে মত দেন।

টঙ্গী বিসিক শিল্পনগরী মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন শেখ অভিযোগ করে বলেন, তিনি তিন বছর ধরে ইটিপি নবায়ন করতে চাইলেও নানান হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

সভায় পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘উৎসমুখ বন্ধ না হলে নদীদূষণ বন্ধ করা সম্ভব না। যদি অধিদপ্তরের কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অসহযোগিতা করে, তাহলে আমাদের অভিযোগ করবেন। আমরা তদন্ত করে দেখব।’  

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থান করেছেন। একবার লন্ডনে তিনি টেমস নদী দেখিয়ে বললেন, ‘‘টেমস নদী এমন ছিল না, এটা ছিল বুড়িগঙ্গার মতো। বুড়িগঙ্গাকে টেমস নদীর মতো বানাতে পারবেন না?’’ এখন ১০ বছর পরে তিনি আমাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন।...আমি আশাবাদী, আপনাদের সহযোগিতা পেলে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যাকে টেমস নদী করা যাবে।’

সভায় পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেন, সম্পদ সৃষ্টি করতে গিয়ে পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না। সরকারের দায়িত্ব দুর্নীতি কমানো ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। আর সম্পদ সৃষ্টির দায়িত্ব ব্যবসায়ী, কৃষকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের। তাই সম্পদ সৃষ্টির সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইটিপি নেই, তাদের দ্রুত ইটিপি স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। আর যেসব প্রতিষ্ঠানে ইটিপি রয়েছে, সেগুলো নিয়মিত চালু রাখতে হবে।

বুড়িগঙ্গাসহ নদীগুলোর দূষণ রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘এক দিনে সব ঠিক করতে পারব না আমরা। তবে বছরের শেষে যদি দেখি আমরা ১০ শতাংশ উন্নত করতে পারছি, তাহলেও আমি মনে করি, এটা আমাদের জন্য একটা সফলতা।’