সাভারে এসবির এসআই হত্যা
প্রাণ বাঁচাতে ছেলের কারখানায় আশ্রয় নিয়েছিলেন পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আলতাব হোসেন। তবে শেষরক্ষা হয়নি। কারখানার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে ধারালো অস্ত্র, এসএস পাইপ ও রড দিয়ে নৃশংসভাবে পিটিয়ে জখম করা হয় এসআই আলতাব ও তাঁর ছেলেকে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারান ওই পুলিশ কর্মকর্তা। মুমূর্ষু ওই কারখানাটি তাঁর বড় ছেলে শরীফুলের।
আজ সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে র্যাব-১০ এর অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি মোহা. আসাদুজ্জামান এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য বর্ণনা করেন।
ঘটনার ২৪ ঘণ্টার আগেই অভিযুক্ত চারজনসহ মোট ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। র্যাব-১০ মুন্সিগঞ্জ থেকে চারজন এবং র্যাব-৪ আমিনবাজার এলাকা থেকে আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করে।
ঘটনার বিবরণে অতিরিক্ত ডিআইজি মোহা. আসাদুজ্জামান জানান, গত ৫ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ৮টা ৩০ মিনিটে সাভারের আমিনবাজার এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। স্পেশাল ব্রাঞ্চে কর্মরত (এসবি) এসআই আলতাব হোসেন তখন সিভিল পোশাকে ছিলেন। আমিনবাজারের একটি গ্যারেজের সামনে প্রবীণ অটোরিকশা গ্যারেজ মালিক আবুল কালাম আজাদকে কয়েকজন মাদকাসক্ত ও অপরাধী অহেতুক মারধর করতে থাকলে মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে তিনি বাধা দিতে যান এবং বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেন।
এতে ক্ষিপ্ত হয়ে এসআই আলতাবের ওপর হামলা চালায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এসআই আলতাব নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। এতে হামলাকারীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
তিনি নিজেকে বাঁচাতে দৌঁড়ে কাছেই থাকা ছেলের কারখানায় গিয়ে আশ্রয় নেন এবং ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেন। কিন্তু হামলাকারীরা আনুমানিক ২৫-৩০ জনের একটি দল জড়ো করে কারখানার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে এসআই আলতাব এবং তাঁর ছোট ছেলে আরিফুলকে হাতুড়ি, এসএস পাইপ ও দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে গুরুতর জখম করে। এ সময় কারখানার মেশিন ও আসবাবপত্রও ভাঙচুর করা হয়।
পরবর্তীতে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এসআই আলতাব হোসেন মারা যান। তাঁর ছেলে আরিফুল বর্তমানে মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
র্যাব-১০ এর অধিনায়ক মোহা. আসাদুজ্জামান জানান, এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে সাভার মডেল থানায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
র্যাব জানায়, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল রোববার ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে র্যাব-১০-এর একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মুন্সিগঞ্জ সদর থানার লঞ্চঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তাররা হলেন—আলাউদ্দিন (২৬), আপন (৩০), জিহাদ (২০) ও ইমরান (২৬)। তাঁদের সবার বাড়ি সাভারের আমিনবাজার এলাকায়। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের গ্রেপ্তার করে বলে জানিয়েছে র্যাব।
এই র্যাব কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার আপন সাভার থানার তিনটি মাদক মামলার আসামি। এর মধ্যে কিশোর গ্যাং লিডার ও হত্যাকাণ্ডের মাস্টার মাইন্ড আপন ও জিহাদ সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। এ ছাড়া মূল লিডার হিসেবে জহিরুলকে ঢাকা জেলা পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
এদিকে একই ঘটনায় র্যাব-৪-এর একটি দল তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সাভারের আমিনবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁরা হলেন নূর মোহাম্মদ রুদ্র (২৪), রাকিব মিয়া (২৮), ছাব্বির আহম্মেদ (২৪) ও মো. ওয়াসিম (৪০)।
এর আগে রোববার সকালে মামলার প্রধান আসামি জহিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে সাভার থানা-পুলিশ। জহিরুল ইসলামকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আজ সোমবার ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তার অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার আদালতে পাঠানোর কথা রয়েছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে বলে র্যাব অধিনায়ক জানান, তাঁরা ওই এলাকায় কিশোর গ্যাং পরিচালনা ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঘটনাটিকে অত্যন্ত নৃশংস উল্লেখ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি কোনো পূর্বপরিকল্পিত বা পুলিশকে টার্গেট করা হামলা ছিল না; বরং একজন সাধারণ নাগরিককে বাঁচাতে গিয়ে মাদকাসক্ত ও কিশোর গ্যাংয়ের উগ্র আচরণের শিকার হতে হয়েছে ওই কর্মকর্তাকে। মামলার বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার এবং বিচারে সোপর্দ করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
র্যাব-১০ এর কর্মকর্তা ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ৫৯ ধারা উল্লেখ করে বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধি, এই আইন অনুযায়ী কেবল পুলিশই নয়, যেকোনো সাধারণ নাগরিকও তাদের সামনে ঘটে যাওয়া বড় কোনো অপরাধের আসামি বা অপরাধীকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করার আইনি অধিকার ও দায়িত্ব রাখেন। অথচ আমরা দেখি কেউ ভিডিও করাতে ব্যস্ত। নাগরিকের দায়িত্বের জায়গা থেকে এ ধরণের ঘটনায় প্রতিহত করার প্রয়োজনীয়তা ও সচেতনতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
সাংবাদিকের এক প্রশ্নে জামিনের বিষয়ে র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা অপরাধীকে বা অভিযুক্তকে আইনের আওতায় এনে বিচারের জন্য সোপর্দ করা এবং প্রাথমিকভাবে আমরা তাদের গ্রেপ্তার করে থাকি। জামিনের বিষয়টা টোটালি এটা আমাদের এখতিয়ারভুক্ত, এখতিয়ারাধীন কোনো বিষয় নয়। তবে জামিনের জন্য আমাদের তরফ থেকে আমরা আলোচনার মধ্যে আছি এবং বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার্স এবং কনসার্ন জায়গাগুলোতে আমরা এই মেসেজটার চেষ্টা করছি যে, আইনি যদি কোনো সংশোধনের সুযোগ থাকে...বিশেষ করে আইনি সংশোধনের মাধ্যমে যদি অপরাধীদের আরও কারাবাস বা কারাবাসের সময় দীর্ঘায়িত করা যায় বা তাদের বেশিদিন আটকে রাখা যায় আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, সেটা আমরা কনসার্ন সকল জায়গাতে আমরা একটা আলোচনার পর্যায়ে রয়েছি।’