খেয়ে না খেয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভিক্ষা করে তিন বছরে ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা জমিয়েছিলেন বৃদ্ধ নুর আলম। জীবনের শেষবেলায় সেই সঞ্চয় নিয়ে গ্রামের বাড়ি ফেরার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সাভারের তালবাগ এলাকায় শামীম হোসেন নামে চিহ্নিত এক মাদকসেবী তাঁর সেই টাকা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেছেন।
ঘটনার পর নুর আলম সাভার মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পান সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ফারুক হোসেন। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ব্যক্তি।
নুর আলমের বাড়ি পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলায়। বর্তমানে তিনি সাভার পৌর এলাকার তালবাগে জীর্ণ একটি কক্ষে ভাড়া থাকেন। স্ত্রী-সন্তান থাকলেও তাঁদের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই।
নুর আলম জানান, প্রায় তিন বছর আগে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। পরে কিছুটা সুস্থ হলে জীবিকার তাগিদে ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করেন। প্রতিদিন ভিক্ষা করে যা আয় হতো, নিজের ন্যূনতম খরচ মিটিয়ে বাকি টাকা স্থানীয় ব্যবসায়ী লিটনের কাছে জমা রাখতেন। এভাবে তিন বছরে তিনি ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা সঞ্চয় করেন। সেই টাকা নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর।
ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মে তিনি ব্যবসায়ী লিটনের কাছ থেকে জমিয়ে রাখা টাকা নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। পথে প্রতিবেশী আব্দুল মজিদ ব্যাপারীর সঙ্গে দেখা হলে তিনি টাকার বিষয়টি জানান এবং কোমর থেকে বের করে টাকাগুলো দেখান। সে সময় ঘটনাস্থলে শামীম হোসেনও উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিবেশী গোলাম কিবরিয়ার স্ত্রী নাজমা বেগম বলেন, নুর আলম বাসায় ফিরে ঘরে ঢোকার পরপরই শামীম পিছু নিয়ে নুর আলমের কক্ষে প্রবেশ করেন। এরপর শামীম নুর আলমকে বলেন, তাঁর মা তাঁকে দুপুরের খাবারের জন্য দাওয়াত দিয়েছেন। নুর আলম বিষয়টি বিশ্বাস করে টাকাগুলো সঙ্গে নিয়ে শামীমের সঙ্গে যান।
নুর আলম বলেন, বাসা থেকে বের হওয়ার পরপরই শামীম তাঁকে একটি নির্জন রাস্তায় নিয়ে যান। সেখানে সুযোগ বুঝে তাঁর কোমরে রাখা ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যান।
নুর আলম আরও বলেন, ঘটনার কয়েক দিন পর তিনি এক প্রতিবেশীর সহায়তায় সাভার মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের তদন্তভার পান এএসআই ফারুক হোসেন। তিনি আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির বাবা শাহ আলমের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি মীমাংসার ব্যবস্থা করেন।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শাহ আলম মাসিক ৩ হাজার টাকা করে কিস্তিতে ক্ষতিপূরণ হিসেবে পরিশোধ করবেন।
তবে নুর আলমের দাবি, তিনি ওই সিদ্ধান্ত মানেননি। এর পর থেকে তিনি থানায় মামলা করার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ধরনা দিয়ে যাচ্ছেন। সর্বশেষ আজ বুধবার থানার পাশে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে তাঁর দেখা হলে তিনি সব খুলে বলেন।
জানতে চাইলে শামীমের বাবা শাহ আলম বলেন, ‘আমার ছেলে খারাপ হয়ে গেছে। ওর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। এরপরও পুলিশের কথায় আমি মাসে মাসে ৩ হাজার টাকা দিতে রাজি হয়েছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এএসআই ফারুক হোসেন বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে শামীম হোসেন পলাতক। তাঁকে না পাওয়ায় তাঁর বাবার সঙ্গে কথা বলে অন্তত কিছু অর্থ যেন ওই বৃদ্ধ পান, সে চেষ্টা করেছি। সব সমস্যার সমাধান শুধু মামলায় হয় না। তাই মাসিক ৩ হাজার টাকা কিস্তিতে ১ লাখ টাকা পরিশোধের একটি সমঝোতা হয়েছে।’
ফারুক হোসেন আরও বলেন, ‘ভুক্তভোগী নুর আলম যদি চান, তাহলে থানায় মামলা গ্রহণ করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’