হোম > সারা দেশ > ঢাকা

সাভার-আশুলিয়ায় ১২ দিনে ১৬ বোমা উদ্ধার, আতঙ্কে স্থানীয়রা

অরূপ রায়, সাভার

সাভারে বোমাসদৃশ প্রেসার কুকার ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ায় গত ১২ দিনে পৃথক তিনটি এলাকা থেকে ১৬টি শক্তিশালী বোমা উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। উদ্ধার করা বোমাগুলোর সঙ্গে জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) লিফলেট পাওয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার গভীর রাতে সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নের লালটেক গোপের বাড়ি এলাকার জামিআ ইলমুল ইলাহ্ সোসাইটি মাদ্রাসা ও জামে মসজিদের সামনের জঙ্গল থেকে স্কচটেপে মোড়ানো প্রেসার কুকারসদৃশ একটি শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করা হয়।

একই রাতে সাভারের তেঁতুলঝরা ইউনিয়নের শ্যামপুর ও হেমায়েতপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও ১৪টি পাইপবোমা এবং বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় হেমায়েতপুর এলাকা থেকে আরিফ হোসেন (২৮) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তারের সময় তাঁর কাছ থেকে পাঁচটি পাইপবোমা পাওয়া যায়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যমতে একটি বাড়ি থেকে আরও নয়টি পাইপবোমা উদ্ধার করা হয়।

এর আগে গত ৩০ জুলাই মধ্যরাতে আশুলিয়ার চারাবাগ এলাকায় জয়ী জেনারেল স্টোরের সামনে একটি ট্রাভেল ব্যাগ থেকে স্কচটেপে মোড়ানো প্রেসার কুকারসদৃশ আরও একটি শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করা হয়। পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা সেটি একটি খোলা মাঠে নিয়ে নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় নিষ্ক্রিয় করেন।

মাদ্রাসার সামনে ড্রামে বোমা

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গতকাল দিবাগত রাত ১টার দিকে ব্যাটারিচালিত একটি বাইকে করে তিন ব্যক্তি লালটেক গোপের বাড়ি এলাকার মাদ্রাসার সামনে আসেন। বিদ্যুৎ না থাকায় ওই সময় এলাকা কিছুটা অন্ধকার ছিল। তাঁরা মাদ্রাসার পাশের জঙ্গলের মধ্যে একটি ড্রাম রেখে দ্রুত সেখান থেকে চলে যান।

মাদ্রাসার পাশের বাসিন্দা ও চায়ের দোকানি আজিম উদ্দিন বলেন, ‘রাত ১টার দিকে ব্যাটারিচালিত হ্যালো বাইকে করে তিন ব্যক্তি এসে মাদ্রাসার সামনে জঙ্গলের মধ্যে একটি ড্রাম রেখে যান। তখন বিদ্যুৎ ছিল না। ড্রাম ফেলার শব্দ শুনে চোর ভেবে পাশের বাড়ির দেলোয়ার হোসেন ঘর থেকে বের হয়ে আমাকে ডেকে তোলেন। ঘর থেকে বের হয়ে আমরা তিনজন লোক ও একটি হ্যালো বাইক দেখতে পাই। আমাদের দেখেই তাঁরা হ্যালো বাইক নিয়ে সাধাপুরের দিকে চলে যান।’

আজিম উদ্দিন আরও বলেন, ‘পরে জঙ্গলের মধ্যে ড্রামটি পড়ে থাকতে দেখি। বিষয়টি জানাজানি হলে আরও লোকজন সেখানে জড়ো হন। পরে কয়েকজন মিলে ড্রামটি মাদ্রাসা ও মসজিদের মূল ফটকের সামনে নিয়ে রাখি। এরপর মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিষয়টি জানানো হয়।’

মাদ্রাসার কিতাবখানার দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল রাফি জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে বিষয়টি জানার পর তাঁরা ড্রামের ঢাকনা খুলে ভেতরে কোরআন, কিছু তার, জামাকাপড়, একটি ডায়েরি, বাকরখানি ও স্কচটেপে মোড়ানো প্রেসার কুকারসদৃশ একটি বোমা দেখতে পান।

আব্দুল্লাহ আল রাফির দাবি, ড্রামের ভেতরে একটি রিমোট কন্ট্রোলও ছিল। ওই রিমোট কন্ট্রোল ও বোমাটির গায়ে আর ওয়ান (R1) লেখা ছিল। তাঁর ধারণা, এটি কোনো সংকেত হতে পারে।

মাঠে সরিয়ে রাখা হয় বোমা: মাদ্রাসার পাশের মানিকগঞ্জ ভ্যারাইটিজ স্টোরের মালিক রফিকুল ইসলাম বলেন, ড্রাম থেকে বোমাটি বের করে মাদ্রাসার মূল ফটক থেকে কিছুটা দূরে মাঠের একটি খোলা জায়গায় রাখা হয়। ড্রাম ও রিমোট কন্ট্রোলটি তখন মাদ্রাসার প্রধান ফটকের সামনে ছিল।

রফিকুল ইসলাম বলেন, বোমাটির ওজন অন্তত ১৫ কেজি হবে বলে মনে হয়েছে। ভোর ৬টার দিকে কয়েকজন ব্যক্তি ব্যাটারিচালিত হ্যালো বাইকে করে এসে রিমোট কন্ট্রোলসহ ড্রামটি নিয়ে দ্রুত চলে যান। পরে বিষয়টি ভবানীপুর পুলিশ ফাঁড়িকে জানালে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে।

রফিকুল ইসলাম বলেন, বোমাটি মাঠে রেখে যাওয়ার পর কীভাবে ও কারা রিমোট কন্ট্রোলসহ ড্রামটি নিয়ে গেছে, তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনী: ভবানীপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. ইমরান হোসেন বলেন, সকালে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বোমাটির চারপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করে। পুলিশের পাহারায় সেটি নিরাপদ স্থানে রাখা হয়। পরে থানা-পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ ও র‍্যাবের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পুরো এলাকা ঘিরে রাখেন।

সাভার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ বলেন, বোমা উদ্ধারের পর বিষয়টি ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলকে জানানো হয়। পরে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে বোমাটি খোলা মাঠে নিয়ে নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় নিষ্ক্রিয় করেন।

নূর মোহাম্মদ আরও বলেন, বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার সময় বিকট শব্দ হয়। এতে আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে।

একের পর এক বোমা উদ্ধারে আতঙ্ক : সাভার ও আশুলিয়ায় অল্প সময়ের ব্যবধানে একের পর এক বোমা উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, বসতবাড়ি, মাদ্রাসা ও জনবহুল এলাকার কাছাকাছি এসব বোমা উদ্ধারের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাসিন্দারা ।

সাভার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ বলেন, উদ্ধার করা বোমাগুলোর উৎস, এগুলো কারা তৈরি করেছে ও কোথায় ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছিল—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া জেএমবির লিফলেটের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।