বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষ থেকে উদ্ভিদ সকলের জন্য সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে গেছেন। যা তাঁর কবিতা থেকে চিঠি, গল্প থেকে গান, উপন্যাস থেকে নাটক, প্রবন্ধ থেকে অভিভাষণ সব জায়গায় দেখা গেছে। শুধু মানুষ নয়, মানুষের পাশাপাশি চারপাশের প্রাণীদের চোখ দিয়েও জীবনকে দেখতে শিখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলা একাডেমিতে আজ বুধবার বিকেলে এক সেমিনার ও আলোচনায় আলোচক ও অতিথিদের বক্তৃতায় এসব বিষয় উঠে আসে।
সেমিনারে রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ চিন্তা শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ। তিনি বলেন, পরিবেশ প্রশ্ন বা সামগ্রিক উন্নয়নচিন্তায় কেবল একতরফাভাবে মানুষকেন্দ্রিকতাকে পরিহার করা জরুরি। সমাজ, ভূগোল ও বিশ্বনিখিলে বিকশিত সমুদয় প্রাণসত্তার কথাই বিবেচনা করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন ‘সহজপাঠ’। আর এটিই সহজভাবে বলতে গেলে রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ চিন্তা। কেবল মানুষ নয়, মৌমাছি কী তরুলতা বা নদীর চোখে জীবনকে দেখতে শেখা। সকলের অস্তিত্ব ও বিকাশকে মান্য করা, সহযোগিতা করা। মূলত তাঁর আহ্বান আমরা যেন আমাদের চারধার থেকে জানতে শিখি, চারধারকে আমাদের মরমে ধারণ করতে সাহস করি। আর এটিই রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ-বীক্ষা।
পাভেল আরও বলেন, ভূমি-জলধারা-অরণ্য কি প্রাণ ও প্রকৃতির ওপর নিরবচ্ছিন্ন অন্যায় ভোগদখল ও পণ্যকরণের ওপরই টিকে আছে চলতি দুনিয়ার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক উন্নয়ন। আর প্রাণ ও প্রকৃতিবিনাশী এই অন্যায় উন্নয়নধারার সাফাই গাওয়ার ওপরই নির্ভর করে গরিব জাতি রাষ্ট্রসমূহের সার্বভৌম অস্তিত্ব ও রাজনৈতিক পালাবদল। সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় শুধুমাত্র মানুষকে ঘিরেই, আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে ধনী ও ক্ষমতাবানদের স্বার্থেই। এখানে অন্যায়ভাবে বাদ থাকছে সমাজে বিদ্যমান অপরাপর ঐতিহাসিক শ্রেণি সম্পর্ক ও পরিচয়গুলো। তলিয়ে যায় বৃক্ষলতা, গুল্ম, মাছ, পাখি, পতঙ্গ, বাঘ বা শামুকের সংসার।
সেমিনারের ওপরে আলোচনা করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম এবং লেখক ও সম্পাদক ফিরোজ আহমেদ। তাদের কথায় উঠে আসে—রবীন্দ্রনাথ মানুষ থেকে উদ্ভিদ সকলের জন্য সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে গেছেন তাঁর কবিতা থেকে চিঠি, গল্প থেকে গান, উপন্যাস থেকে নাটক, প্রবন্ধ থেকে অভিভাষণ সর্বত্র। পরিবেশ চিন্তা তাঁর কাছে কোনো আলাদা বর্গের ভাবনা নয় বরং তাঁর গোটা সৃজনশীল অস্তিত্বেরই অনিবার্য অংশ। আজকের বৈশ্বিক উষ্ণায়নের যুগেও রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ চিন্তার কথা আমাদের সংগত কারণেই মনে আসে, কারণ তিনি বহু আগেই মানুষ ও মহাবিশ্বের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য যান্ত্রিক অগ্রগতিকে একমাত্র মানদণ্ড না ধরে পরিবেশবান্ধব অগ্রসরমানতাকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন।
আয়োজনের সভাপ্রধান পানিসম্পদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক নন, একই সঙ্গে বিশ্বমানের একজন পরিবেশ-ভাবুকও বটে। তিনি তাঁর জীবন-পরিক্রমায় পরিবেশকে সব সময় ভাবনা বিন্দুর কেন্দ্রে রেখেছেন, তাঁর পাঠককে উদ্বুদ্ধ করেছেন পরিবেশসচেতন হতে। একের পর এক রচনায় তিনি পরিবেশের বিপর্যয়ের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছেন, পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে সম্পাদিত উন্নয়নকর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তাঁর পরিবেশ চিন্তা থেকে দীক্ষা নিয়ে আমরা আজকের দিনেও আমাদের এই পৃথিবীর সার্বিক পরিবেশ নিরাপদ ও সুন্দর করতে নিরলস কাজ করতে পারি।
অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির পরিচালক ও সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সমীর কুমার সরকার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক কাজী রুমানা আহমেদ সোমা। আলোচনার পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা আবৃত্তি করেন নূরুল হাসনাত জিলান। রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন ফাহিম হোসেন চৌধুরী এবং অণিমা রায়।