হোম > সারা দেশ > ঢাকা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হল: ‘সান্ধ্য আইন’ অবসান দাবি

মো. বেলাল হোসেন, ঢাবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হল। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থী জাকিয়া জান্নাত। সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলার সময় এক রাতে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। মেয়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে ঢাকায় ছুটে আসেন তাঁর মা। কিন্তু হল কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পাওয়ায় মেয়ের পাশে থেকে সেবা করার সুযোগ হয়নি তাঁর। জাকিয়ার মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলোর অনেক শিক্ষার্থী প্রচলিত বিভিন্ন নিয়মের কারণে এ রকম ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগ করে আসছেন।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে জাকিয়া জান্নাত আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘মা আমার যত্ন নিতে ঢাকায় এসেছিলেন, যেন আমি কিছুটা সুস্থ হয়ে ভালোভাবে পরীক্ষা দিতে পারি। কিন্তু হলের দায়িত্বরত শিক্ষককে অনেক অনুরোধ করেও তাঁকে ভেতরে নেওয়ার অনুমতি পাইনি।’

জরুরি পরিস্থিতিতেও মা-বোনসহ নারী স্বজনদের হলে প্রবেশে বিধিনিষেধ, এক হলের শিক্ষার্থীর অন্য হলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের হলে ঢুকতে না দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের পর হলে প্রবেশে কড়াকড়িসহ নানা নিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলছেন ঢাবির আবাসিক শিক্ষার্থীরা।

ছাত্রী হলগুলোতে বর্তমানে রাত ১০টার পর শিক্ষার্থীদের হলে প্রবেশে কড়াকড়ি রয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী বিভাগ বা কোনো সংগঠনের অনুষ্ঠান বা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মতো কোনো প্রয়োজনীয় কাজ শেষে রাত ১০টার পর হলে ফিরলে বন্ধ পান গেট। তখন বিশেষ কারণ দেখিয়ে ফ্লোর টিচার বা হল প্রাধ্যক্ষকে ফোন করে অনুমতি নিয়ে হলে প্রবেশ করতে হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, রাত বেশি হলে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা ফোন ধরেন না।

শামসুন নাহার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আয়েশা সিদ্দিকী বলেন, ‘চিকিৎসকের কাছে যেতে হলেও নির্ধারিত কিছু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।’

রাত ১০টার পর হলে প্রবেশে বিধিনিষেধের কারণে একাডেমিক ও পেশাগত কাজে নারী শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ তাঁদের।

ঢাবি বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সাংগঠনিক সম্পাদক ইশরাত জাহান ইমু বলেন, ‘পুরুষ শিক্ষার্থীরা যেখানে গভীর রাত পর্যন্ত নির্বিঘ্নে চলাফেরার সুযোগ পাচ্ছেন, সেখানে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর এই সীমাবদ্ধতা গ্রহণযোগ্য নয়।’

সুফিয়া কামাল হল সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) সানজানা চৌধুরী রাত্রী ছাত্রী হলের গেট ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা, নারী শিক্ষার্থীদের যেকোনো ছাত্রী হলে প্রবেশ এবং শিক্ষার্থীদের পরিবারের নারী সদস্যদের প্রয়োজনে হলের কক্ষ পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার দাবি জানান।

নারী শিক্ষার্থীদের হলবিষয়ক দাবিগুলো আদায়ে ‘অবরোধবাসিনী’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম আত্মপ্রকাশ করেছে। প্ল্যাটফর্মটির পক্ষ থেকে ছাত্রী হলের ‘সান্ধ্য আইন’ বাতিলসহ তিন দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।

সুফিয়া কামাল হলের প্রাধ্যক্ষ ড. সালমা নাসরিন বলেন, ‘এককভাবে কোনো হলের পক্ষে এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে নির্দেশনা দিলে তা বাস্তবায়ন করা হবে।’

রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ ড. হোসনে আরা বেগম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করে সবগুলো মেয়েদের হল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক মো. ইসরাফিল রতন বলেন, ‘আমি মনে করি, নারী শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে স্বাধীনতা থাকা উচিত। তবে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।’

উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, দাবিগুলো নিয়ে ইতিমধ্যে উপাচার্য পাঁচটি ছাত্রী হলের প্রাধ্যক্ষদের নির্দেশনা দিয়েছেন। ১৭ আগস্ট এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সভা হবে। প্রতিটি হলের প্রাধ্যক্ষকে নিজ নিজ হলের শিক্ষার্থী, হল সংসদ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত চাহিদা ও দাবিগুলো চিহ্নিত করতে বলা হয়েছে।