রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় শোক, বিভ্রান্তি ও অভিযোগে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ফ্লোর। হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ রুমের সামনে গিয়ে দেখা যায়, একের পর এক স্বজনের আহাজারি। কারও কোলে সদ্যোজাত শিশুর নিথর দেহ, পাশে বসে আছেন সিজারিয়ান মা। নিজেই ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছেন না, এই অবস্থায় তাঁকে মেনে নিতে হচ্ছে সন্তানের মৃত্যু।
যে বয়সে শিশুদের মায়ের বুকের উষ্ণতায় থাকার কথা, সেই এক থেকে চার দিন বয়সী নবজাতকদের মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পরিবারগুলো। অনেক মা এখনো অস্ত্রোপচারের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেননি। মাতৃত্বের স্বাদ নেওয়ার আগেই তাঁরা সন্তানের মরদেহের পাশে বসে আছেন।
পোস্ট-অপারেটিভ রুমের সামনে বসে ছিলেন শারমিন আক্তার। তাঁর কোলে ভাইয়ের এক দিন বয়সী ছেলের নিথর দেহ। পাশে বসা শিশুটির মা। গতকালই তাঁর সিজার হয়েছে। নিজের সন্তানের মরদেহ কোলে নেওয়ার শক্তিও নেই তাঁর।
শারমিন বলেন, ‘আমার ভাইয়ের ছেলে গতকালও সুস্থ ছিল। কোনো সমস্যা ছিল না। আমার মা পোস্ট-অপারেটিভ রুমে ঢুকেছিলেন। এসি বন্ধ থাকায় ভেতরে দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা ছিল। তিনি অসুস্থ হয়ে দ্রুত বের হয়ে আসেন। আমরা কর্তৃপক্ষকে বললেও তারা গুরুত্ব দেয়নি। সকালে দেখি আমার ভাইয়ের ছেলে বমি করছে। কিছুক্ষণ পর মারা যায়।’
আবু বক্কর নামের এক স্বজন বলেন, ‘আমার বোনের মেয়ে আইসিইউতে ভর্তি। আজ সকালে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে। যেখানে শিশুদের রাখা হয়েছিল, সেই পরিবেশ খুব খারাপ। রাত থেকে কাউকে শিশুদের দেখতে দেওয়া হয়নি। আমরা দেখেছি, অনেক শিশুকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সরানো হয়েছে। এত বড় ঘটনা হলেও স্বজনদের কিছু জানানো হয়নি।’
মৃত্যুর কারণ হিসেবে পুলিশ সূত্র ও স্বজনদের অভিযোগ, পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষের দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকা এবং ভেতরে অস্বাভাবিক গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই নবজাতকেরা অসুস্থ হয়ে পড়ে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে থাকা ছয় নবজাতক অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। চিকিৎসকেরা চেষ্টা করলেও তীব্র শ্বাসকষ্টের কারণে শিশুদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
স্বজনদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর থেকেই ওয়ার্ডে এসি চলছিল। রাতে হঠাৎ এসি বন্ধ হয়ে গেলে একধরনের গন্ধ পুরো কক্ষে ছড়িয়ে পড়ে। রাত ১২টার পর থেকে নবজাতকেরা অসুস্থ হতে শুরু করে। দীর্ঘ সময় ধরে শিশুদের অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা। শিশুদের সঙ্গে থাকা বড়রাও অসুস্থ হয়ে পড়েন।
দুপুরে হাসপাতালের মহাপরিচালক (হসপিটালস অ্যান্ড নার্সিং) অধ্যাপক নাহিদা ইয়াসমিন বলেন, যে ওয়ার্ডে ঘটনাটি ঘটেছে, সেখানে ১১ জন মা ও ৬ জন সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু ছিল। শিশুদের বয়স ছিল এক থেকে দুই দিনের মধ্যে। সিজারের পর নিয়মিতভাবেই ওই ওয়ার্ডে মা ও নবজাতকদের রাখা হয়।
নাহিদা ইয়াসমিন আরও বলেন, ওয়ার্ডটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় অনেক সময় রোগী বা স্বজনেরা অতিরিক্ত ঠান্ডার অভিযোগ করে এসি বন্ধ রাখতে বলেন। এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে।
নাহিদা ইয়াসমিনের ভাষ্য, রাত ৩টার পর দুটি শিশু অসুস্থ বোধ করলে তাদের নিউনেটাল আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানান, শিশুরা ভালো আছে। পরে তাদের আবার ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
নাহিদা ইয়াসমিন আরও বলেন, সকাল ৬টার পর দায়িত্বরত নার্স ও মায়েরা দেখতে পান শিশুদের অবস্থা আবার খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এরপর ছয় নবজাতককেই নিউনেটাল আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পর দুই শিশুকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। বাকি চার শিশুকে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত তাদেরও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।