হোম > সারা দেশ > ঢাকা

সবুজায়ন: শতকোটি টাকা ব্যয়েও কমছে ঢাকার সবুজ

সাইফুল মাসুম, ঢাকা 

রাজধানীতে সবুজের দেখা মেলা ভার। যে সামান্য সবুজটুকু আছে, তা-ও দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। ছবিটি গতকাল রাজধানীর ওসমানী উদ্যানের একাংশের। আজকের পত্রিকা

রাজধানী ঢাকায় বৃক্ষরোপণে ও সবুজায়ন বাড়াতে এক দশকে শতকোটি টাকার বেশি খরচ করা হয়েছে। কিন্তু পরিবেশবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা ক্যাপসের গবেষণা বলছে, এই সময়ে ঢাকায় গাছপালা আচ্ছাদিত সবুজ এলাকা কমেছে ৩১ শতাংশের বেশি। ১০ বছর আগে ঢাকায় সবুজ এলাকা ছিল ১২ দশমিক ৫২ শতাংশ, বর্তমানে তা ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক দশক আগেও ঢাকা মহানগরে পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা ছিল। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর অবকাঠামো নির্মাণের কারণে সবুজ এলাকা কমেছে। গাছ ও সবুজ বিয়োগ হওয়া থামছে না।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ১২ বছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়নে খরচ করেছে ৮২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এ সময় ঢাকায় ছাদবাগান বাড়াতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ও মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) যৌথভাবে তিন বছর মেয়াদি ‘নগর কৃষি উৎপাদন সহায়ক (পাইলট) প্রকল্পে’ ব্যয় করেছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। দুই সিটি এবং এই প্রকল্পের মোট ব্যয় শতকোটি টাকার বেশি। এ ছাড়া রাজধানীতে গাছ লাগাতে ও সবুজায়নে গত এক দশকে বন অধিদপ্তর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংস্থাও অর্থ ব্যয় করেছে।

ডিএনসিসির ব্যয় ৫০ কোটি, ডিএসসিসির ৩২ কোটির বেশি ডিএনসিসির বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১২ বছরে ডিএনসিসি বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়নে ব্যয় ৫০ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ব্যয় করেছে ১৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেই ব্যয় হয়েছে ১৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বৃক্ষরোপণে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২১ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে জানতে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের সঙ্গে মোবাইলে একাধিকবার কল দিয়ে এবং খুদে বার্তা পাঠিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি। তবে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সঠিক পরিচর্যার কারণে অনেক সময় বৃক্ষরোপণ টেকসই হয় না। আগামী পাঁচ বছরে ডিএনসিসি এলাকায় পাঁচ লাখ বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ৫৫ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে। কর্মসূচির আওতায় ৫০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী সরাসরি রোপণ করা গাছের পরিচর্যার কাজে যুক্ত থাকবে।

ডিএনসিসির সঙ্গে যৌথভাবে ঢাকা শহর সবুজায়ন ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমে বিভিন্ন সময় কাজ করেছে বেসরকারি সংগঠন গ্রিন সেভার্স। সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী আহসান রনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ঢাকায় সবুজায়ন হয় ঠিকাদারি মডেলে। রাস্তা তৈরির ঠিকাদার পায় বৃক্ষরোপণের কাজ। পরিকল্পিতভাবে সবুজায়নে ঘাটতি রয়েছে। ফাঁকা জায়গা দেখলেই গাছ লাগানো ঠিক নয়। এই অঞ্চলের মাটির উপযোগী গাছ লাগাতে হবে।’

ডিএসসিসির বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১২ বছরে বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়নে সংস্থাটির মোট ব্যয় ৩২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে বৃক্ষরোপণ ও সৌন্দর্যবর্ধন খাতে ব্যয় করেছে ২২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বনায়ন, সবুজায়ন ও বাগান পরিচর্যা খাতে ব্যয় করে ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

খরচের পরও সবুজায়ন কমছে কেন—জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, তিনি নতুন যোগদান করেছেন। দক্ষিণ সিটিতে বিগত সময়ে বৃক্ষরোপণের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে বলতে পারবেন।

ঢাকায় ছাদবাগান বাড়াতে তিন বছর মেয়াদি (২০১৯ থেকে ২০২১ সাল) নগর কৃষি উৎপাদন সহায়ক পাইলট প্রকল্পে যৌথভাবে প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট।

১০ বছরে সবুজ এলাকা কমেছে ৩১ শতাংশ

পরিবেশবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে রাজধানীতে গাছপালা আচ্ছাদিত এলাকা ছিল ৩ হাজার ৭৮৪ দশমিক ১৯ হেক্টর, যা মোট এলাকার ১২ দশমিক ৫২ শতাংশ। ২০২৫ সালে এটি কমে ২ হাজার ৬০৮ দশমিক ৯৯ হেক্টরে নেমেছে, যা মোট এলাকার মাত্র ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ জুড়ে রয়েছে। অর্থাৎ ১০ বছরে গাছপালা আচ্ছাদিত প্রায় ১ হাজার ১৭৫ দশমিক ২০ হেক্টর এলাকা হারিয়ে গেছে। এতে মোট সবুজ এলাকার ৩১ দশমিক ০৬ শতাংশ কমে গেছে।

ওই গবেষণার ফলাফলের তথ্য অনুসারে, ২০১৫ সালে ঢাকা শহরের নির্মাণ এলাকার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫ হাজার ১০৭ দশমিক ৮৪ হেক্টর, যা মোট এলাকার ৪৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ২০২৫ সালে এই পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ২২ হাজার ৭৯৩ দশমিক ৫৯ হেক্টর, যা মোট এলাকার ৭৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র ১০ বছরে ঢাকায় নির্মাণ এলাকা প্রায় ৭ হাজার ৬৮৫ দশমিক ৭৫ হেক্টর বা ৫০ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেড়েছে।

‘ঢাকা শহরের ভূমি ব্যবহার ও ভূমি আচ্ছাদনের পরিবর্তন বিশ্লেষণ: ২০১৫-২০২৫’ শীর্ষক এই গবেষণার ফলাফল চলতি আগস্টে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে ওই ১০ বছরে প্রদত্ত ভূমি ব্যবহার ও ভূমি আচ্ছাদন (এলইউএলসি-ল্যান্ড ইউজ অ্যান্ড ল্যান্ড কাভার) মানচিত্র এবং সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ঢাকা শহরের ভূমি ব্যবহার ও ভূমি আচ্ছাদনের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই বিশ্লেষণে মোট প্রায় ৩০ হাজার ২১৯ দশমিক ৪৭ হেক্টর এলাকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

জানতে চাইলে ক্যাপসের চেয়ারম্যান ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘শুধু গাছ লাগালেই হবে না, গাছ সঠিক পরিচর্যা পাচ্ছে কি না, তা স্যাটেলাইট ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’ তিনি জানান, ঢাকার সবুজ এলাকা নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

এর আগে ২০২৩ সালে বন বিভাগ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস ফরেস্ট সার্ভিসের যৌথ উদ্যোগে ঢাকার প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষ জরিপ পরিচালিত হয়। ‘আরবান ট্রি ইনভেনটরি অব ঢাকা সিটি’ শীর্ষক ওই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ৩০৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৩ লাখ গাছ রয়েছে। ডিএসসিসিতে বৃক্ষ আচ্ছাদিত বা সবুজ এলাকা ১০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ডিএনসিসিতে সবুজ এলাকা ১০ দশমিক ৫ শতাংশ।

ইউএস ফরেস্ট সার্ভিসের গবেষক সামস উদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতায় ঢাকায় টেকসই সবুজায়ন হচ্ছে না। ঢাকায় বৃক্ষরোপণ বিষয়ে সরকারের কোনো গাইডলাইনও নেই। রাজধানীতে সবুজ এলাকা কমার পেছনে অনিয়ন্ত্রিতভাবে সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো তৈরিকে দায়ী করেন তিনি।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘গাছ লাগাতে টাকা ব্যয় পরও সবুজায়ন না বাড়ার জন্য সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি করা উচিত। সবুজায়নের নামে শুধু অর্থ লোপাট হয়েছে কি না, তা-ও সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত।’