মেয়েকে বিয়ে দেবেন বলে জমি বিক্রির টাকা নিয়ে জামালপুর থেকে বাসে করে গাজীপুরে ফিরছিলেন ইসমাইল হোসেন (৫০)। রাজধানীর বনানীতে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর মুখে স্কচটেপ লাগানো অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তাঁর মরদেহ। এ ঘটনায় বাসচালক, সুপারভাইজার ও হেলপারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
জানা গেছে, বাসযাত্রী ইসমাইলের লুঙ্গির কোচে রাখা বিপুল অংকের টাকা দেখেই তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বাসের সুপারভাইজার ও চালক। নির্ধারিত গন্তব্যে না নামিয়ে বাসের মধ্যেই হাত-মুখ বেঁধে হত্যা করা হয় তাঁকে। পরে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে রাখা হয় মরদেহ।
আজ রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন ‘রাজ ক্লাসিক’ পরিবহনের বাসচালক সোহেল রানা (৪১), সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৬) ও হেলপার মো. মনির হোসেন (১৯)।
ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন বলেন, গত ৪ সেপ্টেম্বর সকাল পৌনে ৯টার দিকে বনানী থানাধীন এয়ারপোর্টগামী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের স্টেডিয়ামসংলগ্ন এলাকায় এক ব্যক্তির মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে। তাঁর মুখ ও দুই হাত স্কচটেপ দিয়ে বাঁধা ছিল। গলায়ও কালো দাগ পাওয়া যায়। পরে সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে পরে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তাঁর নাম ইসমাইল হোসেন। পরিবারের সদস্যরা থানায় এসে মরদেহের ছবি দেখে তাঁকে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে বাদী হয়ে বনানী থানায় হত্যা মামলা করেন।
পুলিশ জানায়, নিহত ইসমাইল জামালপুর থেকে জমি বিক্রির প্রায় ৫ লাখ টাকা নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুরে যাচ্ছিলেন। তাঁর ছেলে হাসান জিরানী বাসস্ট্যান্ডে বাবার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। একপর্যায়ে ইসমাইলের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা শুরু করে পুলিশ। এতে একটি বাসের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে সেটিকে শনাক্ত করা হয়। পরে জামালপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ‘রাজ ক্লাসিক’ বাসটি জব্দ করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন ও হেলপার মনির হোসেনকে। পরে পৃথক অভিযানে চালক সোহেল রানাকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে জামালপুরের দিকপাই বাসস্ট্যান্ড থেকে ইসমাইলকে ওই বাসে তোলা হয়। কিছুক্ষণ পর সুপারভাইজার সাজু ভাড়া চাইলে ইসমাইল কোমরের লুঙ্গির কোচ থেকে টাকা বের করে ভাড়া দেন। তখন তাঁর কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ টাকা দেখতে পান সাজু। পরে বিষয়টি তিনি চালককে জানান। ইসমাইলের কাছে অনেক টাকা রয়েছে বুঝতে পেরে তাঁরা টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, চান্দুরা বাসস্ট্যান্ডে ইসমাইলকে না নামিয়ে অন্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। ইসমাইলকে বলা হয়, তিনি যেন ঘুমিয়ে থাকেন। নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছালে তাঁকে ডেকে নামিয়ে দেওয়া হবে।
ইসমাইল ঘুমিয়ে পড়লে বাসটি গাজীপুরের নির্ধারিত গন্তব্যে না গিয়ে ঢাকার দিকে নিয়ে আসা হয়। একপর্যায়ে সুপারভাইজার ও হেলপার মিলে তাঁর হাত ও মুখ স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলেন। পরে গামছা পেঁচিয়ে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
মো. ফারুক হোসেন আরও জানান, হত্যার পর বাসটি বিমানবন্দর থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে বনানীর দিকে আসে। পরে ইউটার্ন নিয়ে আবার বিমানবন্দরের দিকে যাওয়ার সময় এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ইসমাইলের মরদেহ ফেলে রেখে পালিয়ে যান আসামিরা।
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, নিহত ইসমাইলের কাছে জমি বিক্রির প্রায় ৫ লাখ টাকা ছিল। তবে গ্রেপ্তাররা পুরো টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেননি। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা প্রায় আড়াই লাখ টাকা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। বাকি টাকার বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।