রাজধানীর মধ্য বাড্ডায় প্রায় দেড় মাস ওয়াসার সরবরাহ করা পানিতে ময়লা ও তীব্র দুর্গন্ধের অভিযোগ উঠেছে। বাসিন্দারা বলছেন, পানি ফুটিয়েও গন্ধ দূর হচ্ছে না। অনেকে খাওয়ার জন্য বোতলের পানি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণে এলাকায় ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রকোপও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
মধ্য বাড্ডার অনেক বাসিন্দার ভাষ্য, এলাকায় পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বহু মানুষ। বহুতল ভবনগুলোর প্রতিটিতে এক বা একাধিক রোগী দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় একটি ওষুধের দোকানের কর্মীর ভাষ্য, তাঁর দোকানে স্যালাইনের বিক্রি অনেক বেড়ে গেছে। পরিচিত অনেক ক্রেতাকে হাসপাতালে যেতে হয়েছে।
এলাকার বৈশাখী সরণির উদয়ন স্কুলের পাশের নূর সালেহিন রুপম স্যানিটারির মালিক মো. পলাশ বলেন, ‘প্রায় দেড় মাস পানিতে ময়লা দেখা যাচ্ছে। প্রথমে পানি ফুটিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু এত দুর্গন্ধ যে ফুটিয়েও লাভ হয় না। বাধ্য হয়ে পানি কিনে খাচ্ছি।’
পলাশের কথায়, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দুর্ভোগের সঙ্গে পানির সংকট যুক্ত হওয়ায় এই এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগে আছে।
একই এলাকার বিসমিল্লাহ হেয়ার স্টাইলের এক কর্মী জানান, কিছুদিন আগে তিনি চুল-দাড়ি কাটার পর এক খদ্দেরের মুখ পরিষ্কার করতে গিয়ে ট্যাপের পানিতে অনেক ময়লা দেখতে পান। পরে বাইরে থেকে পানি কিনে এনে কাজ শেষ করতে হয়।’
এলাকা ঘুরে দেখার সময় এ প্রতিবেদক দোকানে পানির বড় বোতল বিক্রি হতে দেখেন। কলেজশিক্ষার্থী ফাহিম হোসেন একটি দোকান থেকে পাঁচ লিটারের দুটি বড় বোতল কিনছিলেন। ফাহিম জানান, তাঁদের তিন সদস্যের পরিবারে প্রতিদিন প্রায় ১০ লিটার খাবার পানি প্রয়োজন হয়।
ফাহিম বলেন, ‘এক মাসের বেশি সময় ধরে পানি কিনে খাচ্ছি। তবে সব সময় তো এভাবে পানি কেনা সম্ভব নয়। তাই বোতলের পানি শেষ হয়ে গেলে কেউ ওয়াসার পানি পান করলেই পেটের সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে।’
স্থানীয় দোকান এভরি ডে শপিংয়ের মালিক মো. শাহেদুল বলেন, ‘আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি পানি বিক্রি হচ্ছে। আর ছোট বোতলের চেয়ে বড় বোতলের চাহিদা বেশি। তার মানে বাসার জন্য কেনা হচ্ছে এ পানি।’
পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পরিবারের সদস্যদের হাসপাতালে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানান স্থানীয় বাসিন্দা খাদিজা খাতুন। প্রথমে তাঁর স্বামী ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। পরে মেয়েকেও হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।
খাদিজা বলেন, ‘স্বামীকে মহাখালীর কলেরা হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলাম। পরে মেয়ের জন্যও একই হাসপাতালে যেতে হয়েছে।’
খাদিজার দাবি, তাঁদের বাসার ভাড়াটেসহ ১০-১২ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন।
স্থানীয় আদর্শ ফার্মেসির কর্মী আব্দুল কাদের বলেন, ‘প্রতিদিনই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত রোগীর স্বজনেরা ওষুধ ও স্যালাইন কিনতে আসছেন। আজও আমার চেনা প্রায় ১০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।’
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবির সিনিয়র গবেষক ড. মো. রশিদুল হক বলেন, ‘অনিরাপদ পানি পান করলে ডায়রিয়া, কলেরা ও টাইফয়েডসহ নানা ধরনের রোগ হতে পারে। পানি অপরিষ্কার থাকলে তা ফুটিয়ে খাওয়া যেতে পারে। এতে হয়তো গন্ধ দূর হবে না। তবে ডায়রিয়ার মতো রোগগুলো থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।’
স্থানীয় বাসিন্দা মীর লুৎফর রহমান ফিরোজ অভিযোগ করেন, ওয়াসার কর্মকর্তাদের জানিয়েও কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, “প্রায় দেড় মাস এই ভোগান্তি চলছে। ওয়াসার লোকজনকে জানালে এসে বলে, ‘সব ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই’। কিন্তু বাস্তবে তো মানুষ পানিই খেতে পারছে না।” পানিতে ময়লা যুক্ত হওয়ার কারণ হিসেবে অবৈধ সংযোগকে দায়ী করছেন ওয়াসার কর্মকর্তারা। মধ্য বাড্ডা ওয়াসার মডস জোন-৮-এর অন্তর্ভুক্ত। জোনটির সহকারী প্রকৌশলী মো. মোস্তফা বলেন, ‘শুক্রবারও আমাদের লোকজন গিয়ে কাজ করে এসেছে। আবারও যাবে।...এলাকার কেউ কেউ হয়তো চুরি করে বা আমাদের না জানিয়ে অবৈধভাবে লাইন সংযোগ দিয়েছে। এ কারণে সমস্যা হয়েছে বলে মনে করি।’