‘আবাসিক’ শ্রেণির উচ্চমূল্যের জমিকে ‘নাল জমি’ দেখিয়ে এবং দলিলে জমির প্রকৃত মূল্য কম উল্লেখ করে কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার একটি ঘটনায় প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রাজধানীর তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে অভিযান চালিয়ে এমন তথ্য পেয়েছে সংস্থাটির এনফোর্সমেন্ট বিভাগ।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুদকের সহকারী পরিচালক আল আমিনের নেতৃত্বে একটি দল এ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে বাড্ডা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের কার্যক্রমের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দলিল, রেজিস্ট্রেশন নথি ও অন্যান্য রেকর্ডপত্র যাচাই করা হয়।
দুদকের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ আজকের পত্রিকাকে অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অভিযানে অংশ নেওয়া দুদকের সহকারী পরিচালক আল আমিন বলেন, চুক্তি বা বায়না দলিলে কোনো কোনো জমির মূল্য ৩ কোটি টাকার বেশি উল্লেখ করা হলেও চূড়ান্ত রেজিস্ট্রেশনের সময় তা কমিয়ে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দেখানোর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ভিটে বা আবাসিক জমিকে ‘নাল জমি’ হিসেবে শ্রেণি পরিবর্তন করে রেজিস্ট্রি দেখানোর ঘটনাও পাওয়া গেছে। এতে বিপুল পরিমাণ সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দুদকের সহকারী পরিচালক আল আমিন বলেন, ‘বায়না দলিল ও চূড়ান্ত রেজিস্ট্রেশন দলিল যাচাই করে জমির মূল্যের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট দলিল ও নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো আরও যাচাই-বাছাই করে কমিশনে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’
অভিযান পরিচালনাকারী দলের সদস্যরা সাধারণ গ্রাহকের মতো রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় নকলনবিশ, দলিল লেখক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেককেই নির্ধারিত পোশাক বা দৃশ্যমান পরিচয়পত্র ছাড়া সেবা দিতে দেখা যায় বলে দুদক জানিয়েছে।
দুদকের কর্মকর্তা আল আমিন বলেন, ‘সাধারণ পোশাকে থাকা ব্যক্তিরা গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা দাবি করছেন–এমন চিত্রও অভিযানে পাওয়া গেছে। কারা কীভাবে এসব অর্থ নিচ্ছেন, তা যাচাই করা হচ্ছে।’
অভিযানে আরও দেখা যায়, কার্যালয়ে সিটিজেন চার্টার টাঙানো থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ নেই। ফলে সরকারি নির্ধারিত ফি ও সেবা-সংক্রান্ত তথ্যের বদলে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছে দুদক।
অভিযানকালে সংশ্লিষ্ট জমির দলিল, রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত নথি ও অন্যান্য রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নথি বিশ্লেষণ করে জমির শ্রেণি পরিবর্তন, মূল্য কম দেখানো এবং রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ নিরূপণ করা হবে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০টি দলিল রেজিস্ট্রি হয়। বিপুলসংখ্যক দলিল রেজিস্ট্রির এই কার্যক্রমকে ঘিরে দালালচক্র ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীদের মাধ্যমে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া, পিয়ন, অফিস সহকারী, মোহরার, এক্সট্রা মোহরার, নকলনবিশ ও দলিল লেখকদের একটি অংশের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ভুয়া নামজারি ও অন্যান্য জাল কাগজপত্র তৈরি করে জমি রেজিস্ট্রি করার অভিযোগও যাচাই করছে দুদক।
ঢাকা জেলার জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ লিখিতভাবে পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দালালদের বিষয়ে অভিযোগ থাকলেও তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
দুদকের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ বলেন, ‘বাড্ডা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের বিরুদ্ধে পাওয়া অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতেই তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সহকারী পরিচালক আল আমিনের নেতৃত্বে অভিযান চলছে।’
দুদক সূত্র জানিয়েছে, অভিযানে সংগ্রহ করা নথি ও তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করা হবে। অভিযোগের সত্যতা ও অনিয়মের ধরন নিশ্চিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।