ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি সেলুনে ঢুকে ফরহাদ হোসেন নামের এক যুবককে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। হত্যাকাণ্ডটি ঘটাতে তারা সময় নিয়েছে মাত্র ৩৫ সেকেন্ড।
কেরানীগঞ্জের শাক্তা ইউনিয়নের আরশিনগর এলাকায় আজ মঙ্গলবার বেলা ৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ফরহাদ ওই এলাকার মেম্বার গলিতে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি ভোলায়। পুলিশ বলেছে, নিহত ফরহাদ নিজেও একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলেছে, আজ মঙ্গলবার বিকেলে আরশিনগর এলাকার একটি সেলুনে চুল কাটাচ্ছিলেন ফরহাদ। এ সময় তাঁকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে তাঁকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, বেলা ৩টা ৭ মিনিট ৬ সেকেন্ডে আরশিনগরের রাজ সেলুনে প্রবেশ করেন ক্যাপ পরা দুজন তরুণ। তাঁদের একজনকে কোমর থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র সদৃশ কিছু বের করতে দেখা যায়। তাঁরা সেলুনে প্রবেশের ৯ সেকেন্ড পর দুজন যুবক দৌড়ে বের হয়ে যান। এ সময় চাপাতি হাতে আরও এক তরুণ সেলুনে প্রবেশ করেন। কয়েক সেকেন্ড পর এক যুবক সেলুন থেকে দৌড়ে খালি গায়ে পালানোর চেষ্টা করলে তাঁর পরনের লুঙ্গি পেছন থেকে ক্যাপ পরা এক যুবক টেনে ধরেন। এই অবস্থায় আরও দুজন তাঁকে কোপাতে থাকেন। ৩টা ৭ মিনিট ৪১ সেকেন্ডে তাঁরা ওই যুবককে গুরুতর আহত অবস্থায় ফেলে পালিয়ে যান।
একই বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরাও। তাঁরা বলেছেন, আক্রান্ত ওই যুবক ফরহাদ হোসেন। তিনি সেলুনে চুল কাটাতে গিয়েছিলেন। তিনজন সন্ত্রাসী সেখানে ঢুকে প্রথমে গুলি ছুড়ে আতঙ্ক তৈরি করে। সেলুনে ঢোকার আগেই একজন প্যান্টের পকেট থেকে পিস্তল বের করেন। এরপর সেলুনের ভেতরে এলোপাতাড়ি গুলি শুরু হয়। গুলির শব্দে সেলুনে থাকা অন্যরা আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত বাইরে বের হয়ে আসেন। এরপর বাকি দুজন কোমর থেকে চাপাতি সদৃশ ধারালো অস্ত্র বের করে সেলুনে ঢুকে পড়েন। এ সময় ফরহাদ লুঙ্গি পরা ও খালি গায়ে সেলুন থেকে বের হয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু হামলাকারীদের একজন পেছন থেকে তাঁর লুঙ্গি ধরে ফেলেন। অন্য একজন তখন ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গুরুতর আহত অবস্থায়ও ফরহাদ নিজেকে হামলাকারীদের কাছ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁকে ধরে রেখে উপর্যুপরি কোপানো হয়। একপর্যায়ে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে ফেলে রেখে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। ফুটেজে হামলাকারীদের একজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রও দেখা গেছে।
হামলার পর স্থানীয় লোকজন ও ফরহাদের বন্ধু-স্বজনেরা তাঁকে উদ্ধার করেন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও গুলিতে ফরহাদ গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর জরুরি বিভাগের চিকিৎসক বিকেল ৪টায় তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেলের মর্গের সামনে নিহত ফরহাদের বন্ধু আরিফ ও চাচাতো ভাই আখতার হোসেন দাবি করেন, মোহাম্মদপুরের বসিলা সড়কের ফুটপাতে মাছের ব্যবসা করতেন ফরহাদ। সেখানে কয়েকজন কিশোর গ্যাং সদস্য তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করেছিল। চাঁদা না দেওয়ায় এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
আরিফ বলেন, আরমান, সোহেল, কাল্লু, সাব্বিরসহ ৭–৮ জন ফরহাদের কাছে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার বিনিময়ে চাঁদা দাবি করে। তাঁদের দাবি ছিল এককালীন (অ্যাডভান্স) ৫০ হাজার টাকা এবং প্রতিদিন আলাদা করে টাকা দিতে হবে। ফরহাদ ওই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়।
ফরহাদের বন্ধু সাকিবের অভিযোগ, সাব্বিরের নেতৃত্বে সাগর, হাবিব, আরমানসহ কয়েকজন এ হামলায় অংশ নেয়। তবে হামলার সঙ্গে কারা সরাসরি জড়িত এবং হামলার প্রকৃত কারণ কী—তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ এখন এই ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল কুদ্দুস বলেন, প্রাথমিকভাবে তাঁরা জানতে পেরেছেন, এই ঘটনায় জড়িত দুই পক্ষের লোকজনই মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকার। পূর্ববিরোধের জেরে হামলাকারীরা রায়েরবাজার এলাকা থেকে আরশিনগরে এসে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। হামলায় কারা অংশ নিয়েছে, তাঁদের পরিচয় কী এবং কী কারণে হামলা চালানো হয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে মোহাম্মদপুর থানা-পুলিশ জানিয়েছে, নিহত ফরহাদ নিজেও মোহাম্মদপুরের ‘পাটালি গ্রুপ’ নামে পরিচিত একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ছিলেন। এই গ্যাংটি মোহাম্মদপুরের বোটঘাট ও ময়ূরভিলা এলাকায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা থাকার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
ফরহাদের বিষয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল হালিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, নিহত ফরহাদের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে। সে নিজেও প্যাটালি গ্রুপের সদস্য।
এর আগে গত ১২ এপ্রিল বিকেলে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় দুই কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তারের বিরোধে ‘এলেক্স গ্রুপের’ হোতা ইমন ওরফে এলেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।