ছুটির দিন সকালবেলা রাজধানীর উত্তরায় একটি ফ্ল্যাটবাড়িতে আগুন লেগে প্রাণ হারাল দুই পরিবারের শিশুসহ ছয়জন। ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অসুস্থ আরও অন্তত ১০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকদের বরাতে স্বজনেরা বলেছেন, আগুনে পুড়ে নয়, ঘন কালো ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়েই মারা গেছে তারা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অনেকে আগুন থেকে বাঁচতে ছাদের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দরজায় তালা থাকায় ছাদেও উঠতে পারেননি তাঁরা। নিজেদের ফ্ল্যাটে বা সিঁড়িতেই আটকা পড়েন। ধোঁয়ার তীব্রতায় শ্বাস নিতে না পেরে একসময় অনেকে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।
আজ শুক্রবার সকালে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের ৩৪ নম্বর বাড়িতে এই আগুন লাগে। বেলা তখন ৮টাও হয়নি। ছুটির দিন হওয়ায় কমবেশি সব পরিবারেরই অনেক সদস্য তখন ঘরে ছিলেন।
স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ছয়তলা আবাসিক ভবনটির দোতলার একটি ফ্ল্যাটের রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। তবে ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা বলেন, দোতলার ড্রয়িংরুমের বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকেও আগুন লেগে থাকতে পারে। বিস্তারিত অনুসন্ধানের পর এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
আগুন লাগার পর দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো বাড়ি ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। নিচতলার বাসিন্দারা দ্রুত নেমে যেতে পারলেও পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার লোকজন বের হতে পারেননি। ধোঁয়া এতটাই ঘন ছিল যে, সিঁড়ি দিয়ে নামাও অসম্ভব হয়ে পড়ে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একে একে পাঁচটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। সকাল ৯টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এ সময় থানা-পুলিশ, সেনাবাহিনী ও এলাকাবাসী ফায়ার সার্ভিসকে সহযোগিতা করে।
অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিরা হলো কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮), তাঁর স্ত্রী আফরোজা আক্তার সুবর্ণা (৩৭) ও তাঁদের ছেলে কাজী ফাইয়াজ রিশান (২) এবং হারিছ উদ্দিন (৫২), তাঁর ছেলে মো. রাহাব (১৭) এবং হারিছের ভাতিজি রোদেলা আক্তার (১৪)।
নিহত ফজলে রাব্বি কুমিল্লা জেলার কোতোয়ালি উপজেলার কাজীবাড়ি নানুয়াদীঘির পশ্চিমপাড়া গ্রামের কাজী খোরশেদুল ইসলামের ছেলে। অন্যদিকে হারিছ উদ্দিন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার দড়িপারশী গ্রামের মৃত হাফিজ উদ্দিনের ছেলে। হারিছ পেশায় ফল ব্যবসায়ী ছিলেন।
স্বজনেরা জানিয়েছেন, ফজলে রাব্বি এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস ও তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে চাকরি করতেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় তাঁদের আরেক ছেলে উত্তরায় নানির বাসায় ছিল। নিহত সুবর্ণার মামাতো ভাই মো. আবু সাইদ বলেন, মা-বাবা দুজনই চাকরি করেন বলে দুই সন্তানকেই নানির কাছে রাখা হতো। ছুটির দিনের কারণে ছোট ছেলেকে রাতে নিজের বাসায় নিয়ে এসেছিলেন রাব্বি দম্পতি।
ফায়ার সার্ভিস এসে অচেতনদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ছয়জনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। আহত ব্যক্তিদের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শী হামিদুর রহমান বলেন, ‘দোতলায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। আতঙ্কে লোকজন যে যেভাবে পারেন, নিচে নামেন বা ওপরের দিকে উঠে যান। সিঁড়ি দিয়ে ধোঁয়া দ্রুত ওপরে উঠছিল। ফায়ার সার্ভিস এলে পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার বাসিন্দারা জানালা দিয়ে হাত বের করে সাহায্য চাইছিলেন। দূর থেকে বোঝা যাচ্ছিল, তাঁরা চিৎকারও করতে পারছিলেন না, শুধু কাশছিলেন।’
তিন ইউনিটের ভবনটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা ছিল ডুপ্লেক্স। সেখানে থাকেন বাড়ির মালিক মো. জুয়েল। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ফ্ল্যাটের সবাইসহ চতুর্থ তলার বাসিন্দারা নিচে নামতে পারলেও ধোঁয়ার কারণে এর ওপরের দুটি তলার কেউ নামতে পারেননি।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অসুস্থ লোকজনের স্বজনেরা জানান, কয়েকজন ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলেও তালাবদ্ধ দরজার কারণে ব্যর্থ হন। ফায়ার সার্ভিস এসে মই ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করে ১৫-১৬ জনকে উদ্ধার করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আশপাশের কয়েকজন বাসিন্দা বলেছেন, ভবনটির ছাদে সব সময় তালা মারা থাকে।
উত্তরা ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. আলম হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ড্রয়িংরুমে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত। বিস্তারিত অধিকতর তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে। ভবনটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার ডুপ্লেক্সে প্রচুর কাঠের আসবাব ছিল, যা আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করেছে।
ফায়ার সার্ভিসের কেন্দ্রীয় মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, তাঁরা ঘটনাস্থল থেকে ১৬ জনকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠিয়েছেন।
ডিএমপির উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মো. রফিক আহমেদ বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ভবনটির দোতলার রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।
আজ বিকেলেই মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাতের মধ্যে তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় দাফন সম্পন্ন করার কথা। আগুন নিয়ন্ত্রণের পর বিকেল থেকে ভবনটির ভাড়াটেদের মালামাল নিয়ে চলে যেতে দেখা গেছে। তবে তাঁদের কেউ কথা বলতে রাজি হননি। এ সময় বাইরে অনেক লোক ভিড় করেন। তাঁদের চোখেমুখে ছিল শোকের ছায়া।