হোম > সারা দেশ > কক্সবাজার

ফুটবল কিনতে হাঁস চুরি করা সেই কিশোরদের পাশে ইউএনও

কুতুবদিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি

তিন কিশোরের হাতে ফুটবল তুলে দিচ্ছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান। ছবি: আজকের পত্রিকা

বয়স ১২ কি ১৪ বছর। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন। পাড়ার মাঠে অন্যদের ফুটবল খেলতে দেখে তাদেরও ইচ্ছে হতো বল নিয়ে ছুটতে। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় নিজেদের একটি ফুটবল ক্রয়ের সামর্থ্য ছিল না তাদের।

শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ করতে ভুল পথে পা বাড়ায় কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের তেলিয়াকাটা এলাকার তিন কিশোর। তারা মৎস্য শ্রমিক মামুনের পুত্র মনির উদ্দিন শাহনেক (১৩), মৎস্য শ্রমিক মিজানের পুত্র মিনহাজ (১২) ও দিনমজুর খোরশেদ আলমের পুত্র মুজাহিদ (১১)।

ফুটবল ক্রয়ের টাকা জোগাড় করতে তারা পাশের বাড়ির হাঁস চুরি করে। পরে সেই হাঁস বিক্রি করতে নেওয়া হয় ধুরুং বাজারে। কিন্তু বিক্রির আগেই বিষয়টি জানাজানি হয়। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নজরে আসে উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব আবুল কাশেমের। পরে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমানকে অবহিত করেন তিনি। ইউএনও বিষয়টি দেখলেন ভিন্নভাবে।

তিন কিশোরের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন, হাঁস চুরির পেছনে তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ফুটবল ক্রয়ের টাকা জোগাড় করা। তাদের অভিভাবকেরা দিনমজুর। অভাবের সংসারে সন্তানদের খেলাধুলার সামগ্রী কিনে দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই তাদের।

তিন কিশোরের ভুলের জন্য তাদের বুঝিয়ে সতর্ক করেন ইউএনও। তিনি বলেন, ‘অন্যের জিনিস নেওয়া কোনোভাবেই ঠিক নয়। স্বপ্ন পূরণ করতে হলে সঠিক পথেই এগোতে হবে।’

এরপরই আসে মানবিকতার মুহূর্ত। যে ফুটবল ক্রয়ের জন্য তিন কিশোর ভুল করেছিল। আজ বুধবার বিকেলে অফিসার্স ক্লাবে সেই ফুটবলই তাদের হাতে তুলে দেন ইউএনও মো. মিজানুর রহমান।

এ সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অসীম কুমার দাস, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইকবাল হাসান, উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মুসলিম উদ্দিন, উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব আবুল কাশেম, ক্রীড়া সংগঠক এহাছান মোহাম্মদ ছেটন, মোহাম্মদ মুবিন উপস্থিত ছিলেন।

উত্তর ধুরুং ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ইমরুল ফারুক বলেন, ১২-১৩ বছরের কিশোরদের ভুলকে শুধু অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের পারিবারিক বাস্তবতা, স্বপ্ন এবং বেড়ে ওঠার পরিবেশও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজন শাসনের পাশাপাশি ভালোবাসা, শিক্ষা ও সঠিক দিকনির্দেশনা। তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ধন্যবাদ জানান।

উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব আবুল কাশেম বলেন, ‘তিন কিশোরের গল্পটি শুধু হাঁস চুরি কিংবা একটি ফুটবল পাওয়ার গল্প নয়। এটি অভাবের মধ্যেও স্বপ্ন দেখা তিন কিশোরের গল্প। আর সেই স্বপ্নকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে সঠিক পথে এগিয়ে দেওয়ার এক মানবিক উদ্যোগের গল্প সৃষ্টি করলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান।’

হয়তো কোনো একদিন তেলিয়াকাটার মাঠে এই তিন কিশোরের পায়ে ফুটবল ছুটবে। গোলের পর তারা যখন উচ্ছ্বাসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরবে, তখন মনে পড়বে সেই দিনের কথা। ফুটবলের জন্য যখন তারা ভুল করেছিল, তখন শাস্তির পাশাপাশি একজন মানুষ তাদের স্বপ্নটাকেও বুঝেছিলেন।