হোম > সারা দেশ > কক্সবাজার

কক্সবাজার: বারে মানা হয় না নিয়ম

মাইনউদ্দিন শাহেদ, কক্সবাজার

নিহত যুবক রাশেদ ও মোহাম্মদ সোলাইমান। ছবি: সংগৃহীত

দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হোটেল-রেস্তোরাঁ। সেই সঙ্গে বড় হচ্ছে বার ব্যবসা। এসব বারের বৈধ লাইসেন্স থাকাসহ নিয়ম মেনে পরিচালনার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এগুলোতে নিরাপত্তারও তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই বলে জানা গেছে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজার শহরের ঝাউতলা এলাকার রেনেসাঁ হোটেলের দোতলায় অবস্থিত বারে (অ্যালকোহলজাতীয় পানীয় বিক্রি ও পান করার জায়গা) দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় নাজিবুল হক রাশেদ ও মোহাম্মদ সোলাইমান ওরফে সালমান নামের দুই যুবক নিহত হন। এ ঘটনার পর বার পরিচালনায় ত্রুটি ও অনিয়ম নতুন করে সামনে এসেছে। পুলিশ বলছে, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। বারের নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং সংঘর্ষের সূত্রপাত—সবকিছুই তদন্তের আওতায় রয়েছে।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী আজকের পত্রিকাকে বলেন, বারে হত্যার ঘটনায় রাশেদের পরিবার থেকে ৬ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। এ মামলার ৫ নম্বর আসামি রাফিকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে নিহত সালমানের মা ফাতেমা বেগম বাদী হয়ে গত রোববার সকালে নিহত রাশেদের ভাই শহীদুল হককে প্রধান আসামিসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেছেন।

আইনশৃঙ্খলা ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে বারে হইচই বা ছোটখাটো ঘটনা ঘটলেও হত্যাকাণ্ড এই প্রথম। এ ঘটনার পর থেকে বারগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।

অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ২০২২ অনুযায়ী, মদ পান করতে অনুমতিপত্র নিতে হয়। এই বিধিমালায় বলা হয়েছে, ২১ বছরের নিচে কোনো ব্যক্তির বারে মদ বেচাকেনা এবং পান করার সুযোগ নেই। প্রবেশের সময় তল্লাশি করার নিয়ম রয়েছে। বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত প্রবেশের সুযোগ এবং রাত ১২টার মধ্যে বার বন্ধ রাখার কথা উল্লেখ রয়েছে।

অথচ অধিকাংশ বারে এসব নিয়ম মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২১ বছরের নিচের তরুণ-কিশোরেরা বারে ঢুকে পড়ছে। তল্লাশির শিথিলতায় ধারালো অস্ত্রও ঢুকছে। একটি বারের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেকে রাজনৈতিক এবং স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে বারে ঢুকে পড়ে। তাদের বাধা দিলে কিংবা তল্লাশি করতে চাইলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে ১২টি বারের লাইসেন্স রয়েছে। জেলায় সাড়ে ৫০০ ব্যক্তির মদ পান করার অনুমতি আছে। হোটেল রেনেসাঁয় অবস্থিত কক্সী বার ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সরকারের অনুমোদিত। এটিই শহরের সবচেয়ে পুরোনো বার। অনুমোদনপ্রাপ্ত এই বারের ভেতরে কীভাবে ছুরিসহ লোকজন ঢুকে সংঘর্ষে জড়িয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, যেসব যুবক বারে মদপানের জন্য উঠেছিলেন, আদৌ তাঁদের বৈধ অনুমতিপত্র ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে লাইসেন্সের শর্তের কোনো ব্যত্যয় পেলে বারটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সৈকতের লাবণী পয়েন্টে ট্যুরিস্ট পুলিশ কার্যালয় লাগোয়া কয়লা নামের একটি বারে শনিবার বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, বারের প্রধান ফটক বন্ধ। নিরাপত্তাকর্মী জানান, বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বারে গ্রাহক ঢোকার সুযোগ পায়। সর্বোচ্চ রাত ১২টা পর্যন্ত বার খোলা রাখা হয়। এর কিছুক্ষণ পর রেনেসাঁ হোটেলের কক্সী বারে গিয়ে দেখা যায়, বারটি বন্ধ রাখা হয়েছে।

কয়লা বারের ব্যবস্থাপক রহিম বাদশা বলেন, ‘নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যেই আমরা বার পরিচালনা করছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত বার পরিদর্শন করেন। এ পর্যন্ত আমাদের বারে কোনো অনিয়ম ধরা পড়েনি।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল আজকের পত্রিকাকে বলেন, পর্যটন নগরী হিসেবে কক্সবাজারে অনেক পাঁচ তারকা ও চার তারকা মানের হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সব শর্ত মেনে বার পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। লাইসেন্স পাওয়া ১২টি বার নিয়মিত পরিদর্শন করা হয় জানিয়ে সোমেন মণ্ডল বলেন, এই বারগুলোতে বিশেষ করে বিদেশিদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। পাশাপাশি বৈধ অনুমতিপত্রের বিপরীতে পর্যটক এবং স্থানীয়দের কাছে মদ বিক্রির সুযোগ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, রেনেসাঁর বার পরিচালনায় নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

শহরে বার পরিচালনায় নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে জানিয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) মো. অহিদুর রহমান বলেন, পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে বারে সংঘটিত হত্যার তদন্ত করছে; পাশাপাশি বারের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।