হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে হামের প্রাদুর্ভাব: হাসপাতালে কাতরাচ্ছে শিশুরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে। তাই ওয়ার্ডের বাইরে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছে রোগীরা। তারা হামের উপসর্গ এবং এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে। ছবি: আজকের পত্রিকা

চট্টগ্রাম মহানগর ও ১৫ উপজেলায় গত মার্চের মাঝামাঝি হামের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হামের উপসর্গ এবং এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮ হাজার ৮০ জন। এর মধ্যে ৭ হাজার ৭৮৪ জন হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ হয়েছে। ২৯৬ জন এখন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত মারা গেছে ২১ জন।

চট্টগ্রামের সরল পরিসংখ্যান দিয়ে হসপাতালগুলোর ভোগান্তি চিত্র উঠে আসার সুযোগ নেই। হাসপাতালগুলোয় প্রতিনিয়তই নতুন নতুন রোগী আসছে। এর বেশির ভাগই শিশু। উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন অভিভাবকেরা।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্য অনুসারে, চট্টগ্রাম মহানগর ও ১৫ উপজেলা মিলে গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭৮ জন। এর মধ্যে মহানগরেরই রয়েছে ৭৪ জন। সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত বা এর উপসর্গ নিয়ে ভর্তি থাকা শিশুদের অনেকের অবস্থাই গুরুতর। হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের একটি বড় অংশের নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে এবং বিদ্যুৎ-সংকটের কারণে হামে আক্রান্ত শিশুদের অবস্থা আরও কাহিল।

এই বিষয়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, হাম প্রতিরোধের দুটি বড় উপায় হলো টিকাদান ও আক্রান্ত রোগীকে পৃথক রাখা। হাসপাতালের পাশাপাশি বাড়িতেও আক্রান্ত রোগীকে পৃথক রাখতে হবে।

তবে হাসপাতালে সেই সুযোগ নেই। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হামের জন্য বিশেষায়িত ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি শয্যায় দুই বাচ্চাকে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। শয্যা না পেয়ে অনেকের জায়গা হয়েছে মেঝেতে। অনেকে বাচ্চাকে কোলে রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম পরীক্ষার জন্য ১৬ হাজার ৯৬০টি নমুনা পাঠানো হয়েছে। চট্টগ্রামে হাম নিশ্চিত হয়েছে ৭৪৩ জনের শরীরে। হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১৮ জন। আর নিশ্চিত হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে আরও ৩ জনের। অর্থাৎ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মারা গেছে ২১ জন।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম মহানগরেই সন্দেহজনক হাম রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি। এ পর্যন্ত ৭ হাজার ৭১২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ছাড় পেয়েছে ৭ হাজার ৪২৫ জন। বর্তমানে ভর্তি রয়েছে ২৮৭ জন। মহানগরে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৪৮৬ জন। উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে নগরের ১৪ জন।

অন্যদিকে জেলার ১৫ উপজেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৬৮ জন। এর মধ্যে ৩৫৯ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে ভর্তি আছে ৯ জন। উপজেলায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ২৫৭ জনের। হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে চারজনের।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ইউনিটে মেঝেতেও বিছানা পেতে যেসব শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এর মধ্যে একজন চট্টগ্রামের হালিশহর থেকে আসা শিশু মো. রিফাত। পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হামে আক্রান্ত হয়ে গত ২৮ দিন ধরে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে শিশুটি। সন্তানের এমন কষ্টে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা শিরিন আক্তার।

এমন দশা শুধু শিরিন আক্তারের নয়। এই ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা সব শিশুর অভিভাবকেরই মূলত এই দশা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশেষায়িত এই ওয়ার্ডে শয্যা আছে ৫০টি। পিএসইউ ওয়ার্ডে ১০টি শয্যা আছে হামের জন্য। আর এর বাইরে ওয়ার্ডে ১৬টি আইসোলেশন শয্যা রয়েছে। তবে সব স্থানেই রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণের চেয়ে বেশি।

এই বিষয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় সংকট মোকাবিলায় বাড়তি প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে। রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণও কঠিন হয়ে পড়েছে।