পার্বত্য অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের ভাগ্যবদল, আমিষের চাহিদা পূরণ এবং ক্ষুদ্র খামারিদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সেই সঙ্গে পাহাড়ি জনপদের ভূপ্রকৃতি ও প্রথাগত প্রাণী পালনের রীতি উপেক্ষা করে অবাস্তব পরিকল্পনার কারণে প্রকল্পের উদ্দেশ্যও ভেস্তে যেতে বসেছে।
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি শুরু হওয়া ‘তিনটি পার্বত্য জেলায় সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প’ নামের প্রকল্পটি চলবে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই প্রকল্পে মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার ২৬ উপজেলার ১২৮ ইউনিয়ন রয়েছে।
প্রকল্প বিবরণী অনুযায়ী, মোট খরচের মধ্যে কর্মশালায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার, ভিডিও চিত্র নির্মাণে ৮ লাখ, আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগে ৩৪ লাখ ৬ হাজার, অনিয়মিত শ্রমিক নিয়োগে ২৭ লাখ, পরিবহন ব্যয়ে ২ লাখ, প্রশিক্ষণ ব্যয়ে ২ কোটি ৫৬ লাখ ৭ হাজার, মেডিসিন ও ভ্যাকসিনে ২ কোটি ৫৫ লাখ ৭৮ হাজার, প্রাণীর খাদ্যে ২ কোটি ৮ লাখ ৫ হাজার, মুদ্রণ ও প্রকাশনায় ১৯ লাখ, বেইস লাইন সার্ভেতে ১২ লাখ, প্রকল্প মূল্যায়নে ৭ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়। এ ছাড়া পিডি অফিস রিনোভেশনে ৪ লাখ, পোলট্রি খামার মেরামতে ২০ লাখ, প্যাকেজ অনুদানে ৩১ কোটি ১১ লাখ ৭৬ হাজার, যন্ত্রপাতি কেনায় ৫ লাখ ৫৫ হাজার, আইপিএস ও এয়ার কুলারে ৪ লাখ, ফটোকপি মেশিনে ২ লাখ ৫০ হাজার, আসবাবপত্রে ৬ লাখ ৫৯ হাজার, ইনকিউবেটর মেশিনে ৩ কোটি ২০ লাখ এবং রাঙামাটি পিগ ফার্মের সংস্কার কার্যক্রমে ২ কোটি ২৭ লাখ ১৩ হাজার টাকা ব্যয় ধার্য করা হয়েছে।
প্রকল্পের প্রথম ধাপে ২ হাজার ৫৬০ পরিবারকে ৩০টি করে ফাউমি মুরগি, ২ হাজার ৫৬০ পরিবারকে দুটি করে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, ৩ হাজার ৪৫৬ পরিবারকে ২টি করে ভেড়া এবং ৩ হাজার ২০০ পরিবারকে ২টি করে শূকর এবং প্রাণীগুলো রাখার জন্য একই মাপে, অর্থাৎ ৪ ফুট বাই ৫ ফুটের ১১ হাজার ৭৭৬টি মাচাং ঘর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আর কোনো কিছুই করা হয়নি।
এদিকে প্রাণিসম্পদ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাচাং ঘর তৈরিতে ১০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও এগুলো ভৌগোলিক বাস্তবতায় উপযুক্ত নয়। ফলে সরকারি টাকা নষ্ট হয়েছে।
প্রকল্পে প্রাণীর খাদ্য বাবদ ২ কোটি ৮ লাখ ৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও সুবিধাভোগীরা বলেছেন, তাঁদের কোনো প্রাণীর খাদ্য দেওয়া হয়নি। ফুল রতন চাকমা নামের এক সুবিধাভোগী বলেন, কুতুকছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে আধাবেলা কর্মশালা করা হয়েছে। সেদিন এক প্যাকেট ভাত ও ৮০০ টাকা দেওয়া হয়। তবে শূকর দেওয়ার আগে ও পরে কোনো খাদ্য দেওয়া হয়নি।
কুতুকছড়ি আবাসিক এলাকার শান্তি রাম চাকমা বলেন, ‘দুটি শূকর ছানা ও একটি মাচাং ঘর পেয়েছি।’ ঘর তৈরিতে নিম্নমানের কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সদর উপজেলা পরিষদসংলগ্ন খামারি লুৎফুন নাহার জানান, ৩০টি মুরগির জন্য দেওয়া ঘরটিতে জায়গা না হওয়ায় ১৪টি মুরগি মারা গেছে।
প্রকল্পের নিজস্ব লোকবল না থাকায় উপজেলা কর্মকর্তাদের অফিশিয়াল কাজ ফেলে এসব তদারকি করতে হচ্ছে। অথচ আউটসোর্সিং ও অনিয়মিত শ্রমিক নিয়োগে ৬১ লাখ টাকার বেশি বরাদ্দ থাকলেও প্রকল্পের রাঙামাটির দায়িত্বে থাকা প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কল্পনা চাকমা বলেন, তিন জেলায় আমাদের ৬ জন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জেলা-উপজেলার স্টাফদের নিয়ে কাজ চালাচ্ছি।
সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রীমা মহাজন বলেন, ‘লোকবল সংকটের মধ্যে ভৌগোলিক বাস্তবতায় প্রতি ইউনিয়নে গিয়ে তাদের কাজ দেখাশোনা করা আমাদের জন্য কঠিন একটি বিষয়। এগুলো দেখাশোনার জন্য প্রতি ইউনিয়নে অন্তত একজন করে লোক দেওয়া দরকার ছিল।’
রাঙামাটি পিগ ফার্ম সংস্কারের নামে ২ কোটি ২৭ লাখ ১৩ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও কোনো কাজই শুরু হয়নি। পিগ ফার্মের ব্যবস্থাপক ডা. লেলিন দে জানান, কোনো সংস্কার না হলেও তাঁদের খামার থেকে ইতিমধ্যে প্রকল্পের জন্য প্রায় ৮০টি শূকরের বাচ্চা সরবরাহ করা হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তরিত হলেও পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য প্রতুল চন্দ্র দেওয়ান বলেন, সুনির্দিষ্ট ব্যয় বা ঠিকাদার নিয়োগ সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না।
জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, বিভাগটি তাঁর কাছে ন্যস্ত না থাকায় তিনি এ বিষয়ে অবগত নন।
এসব বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রকল্প পরিচালক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এগুলো সাংবাদিকের জানার বিষয় নয়। এটি সম্পূর্ণ প্রাণিসম্পদ বিভাগের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটি আমরা বুঝব, সাধারণ মানুষের এটি বোঝার দরকার নেই।’