চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানা ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে এমটি রাসি নামক জাহাজটিকে ট্যাংক পরীক্ষা ছাড়াই বিস্ফোরক অধিদপ্তর সনদ দিয়েছিল। সম্প্রতি ওই জাহাজের বিষাক্ত গ্যাসে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় এই তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তদন্ত কমিটি। অন্যদিকে ইয়ার্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় গুরুতর ঘাটতি এবং অবহেলা পাওয়ার কথা জানিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি।
শিল্প মন্ত্রণালয় ও বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত দুটি তদন্ত কমিটি গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডের (বিএসআরবি) কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে ইয়ার্ডমালিকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা এড়াতে ৪৪টি সুপারিশ করা হয়েছে।
বুয়েটের তদন্ত প্রতিবেদনে এমটি রাসি জাহাজের ওয়াটার ব্যালাস্ট ট্যাংকে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিস্ফোরক অধিদপ্তর জাহাজের ট্যাংকে কোনো ধরনের পরীক্ষা না করেই জাহাজটিকে স্ক্র্যাপ হিসেবে কাটতে সনদ দিয়েছিল।
অন্যদিকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাসের তীব্রতা পরীক্ষা না করেই বন্ধের দিনেই তড়িঘড়ি করে কাটা হচ্ছিল জাহাজটি। জাহাজ কাটার সময় ছিল না পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামের ব্যবস্থা। জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক কাটার সময় শ্রমিকেরা গ্যাস মাস্ক বা স্বয়ংসম্পূর্ণ শ্বাসযন্ত্র (এসসিবিএ) ব্যবহার করেননি। ঘটনাস্থলে ছিল না সেফটি ম্যানেজার, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক বা জরুরি উদ্ধারকারী দল। এর ফলে গ্যাসের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ওই ১০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
তদন্ত প্রতিবেদন দুটি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বোর্ডের মহাপরিচালক (ডিজি) শফিউল আলম তালুকদার। তিনি জানান, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনায় যাতে আর কোনো ধরনের প্রাণহানি না হয়, সে ব্যাপারে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। দুর্ঘটনায় ইয়ার্ডমালিকের গাফিলতির যে বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর বেকার হয়ে পড়া জাহাজভাঙা কারখানার ৩০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও মন্ত্রণালয় খতিয়ে দেখবে।
শিপ রিসাইক্লিং গবেষক ও বেসরকারি সংস্থা ইপসার কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, জাহাজভাঙা কারখানায় প্রতিবারই দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়। কমিটির পক্ষ থেকে দুর্ঘটনা এড়াতে প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। কিন্তু এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত না হওয়ায় দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হয় না।
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জমির উদ্দিন বলেন, জাহাজভাঙা শিল্পে কাজভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত ডি-ব্যালাস্টিং পদ্ধতি এবং কাজের অনুমতিপত্র (পিটিডব্লিউ) কঠোরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ ছাড়া ব্যালাস্ট ট্যাংকের বায়ু, বিভিন্ন স্তরের পানি ও বর্জ্য পরীক্ষা করে সম্ভাব্য বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকি নিরূপণ এবং কাজ চলাকালে নিয়মিত বা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস মনিটরিং নিশ্চিত করাসহ গ্যাস মনিটর ও গ্যাস অ্যালার্ট ব্যবহার করতে হবে।
প্রসঙ্গত, গত ১৪ আগস্ট সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী সাগর উপকূলে ফেরদৌস স্টিল ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে আমদানি করা এলএনজি স্ক্র্যাপ জাহাজের ওয়াটার ব্যালাস্ট ট্যাংকে কাটার কাজ করার সময় হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এতে গুরুতর আহত হন আরও ১০ শ্রমিক। দুর্ঘটনার পর শিল্প মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিএ) পক্ষ থেকে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।