হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

অনলাইন প্রতারণা: বিদেশি চক্রের আস্তানা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার

সবুর শুভ ও সোহেল মারমা, চট্টগ্রাম

গ্রেপ্তার বিদেশি নাগরিকেরা। ছবি: সংগৃহীত

পযর্টন শহর কক্সবাজারের নির্জন রিসোর্টের পাশাপাশি চট্টগ্রাম নগরের অভিজাত এলাকা খুলশীর ভবনে আস্তানা গেড়েছিল আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্র। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে দুই এলাকায় গ্রেপ্তার হওয়া ৬৯ বিদেশিকে এই আস্তানা তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন বাংলাদেশি সদস্যরা। বিদেশি এই প্রতারক চক্রের সদস্যরা তাঁদের নিরাপদ অবস্থান হিসেবে কেন চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে বেছে নিয়েছিলেন, তা জানতে বাংলাদেশি দুই হোতাকে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

অনলাইন প্রতারণায় জড়িত অভিযোগে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে ৬৩ এবং কক্সবাজারে ৬ বিদেশিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে বিপুল ডিভাইস জব্দ করা হয়। এমনকি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষেরও ব্যবস্থা ছিল এই চক্রের।

চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ২০ নারীসহ ৬৩ বিদেশি ‘মহসীন’ নামে এক বাংলাদেশির সহায়তায় সেখানে এসেছেন বলে পুলিশ জানায়। ওই ব্যক্তির মাধ্যমে মূলত তাঁরা জুনে দেশে আসার পর ঢাকায় দুই দিন অবস্থান করেন। সেখান থেকে চট্টগ্রামে এসে খুলশী এলাকায় ঘাঁটি গাড়েন।

পুলিশের কাছে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন বিদেশি নাগরিককে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য মিলেছে বলে জানিয়েছে নগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিইউ)। তবে তদন্তের স্বার্থে মহসীনের বিস্তারিত পরিচয় জানায়নি সংস্থাটি। সিটিইউ-এর এক কর্মকর্তা বলেন, ওই ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে পারলে দেশে ঘাঁটি গেড়ে বসা আন্তর্জাতিক এই প্রতারক চক্রের সদস্যদের নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।

খুলশীর আস্তানা

গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ও পরদিন শুক্রবার সকাল পর্যন্ত খুলশী থানাধীন কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর রোডের ৮ তলা একটি ভবনের ১৪টি ফ্ল্যাট থেকে ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করে সিটিইউ ও খুলশী থানার পুলিশ। তাঁদের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওসের ৩৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন ও চীনের ৫ জন এবং ভিয়েতনাম ও নেপালের ১ জন করে নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্রান্ডের ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, ৪টি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়ত্রসহ বেশ কিছু ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় শুক্রবার রাতে সাইবার সুরক্ষা আইনে খুলশী থানায় হওয়ার পর তাঁদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছেন কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক রাসেল মাহমুদ।

মামলাটির তদন্ত সংস্থা সিটিইউ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা গেছে, বিদেশি নাগরিকদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁদের তৎপরতার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েকজন পাকিস্তানি নাগরিক ছাড়া গ্রেপ্তার বাকিরা কেউই নিজ দেশের ভাষা ছাড়া ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষা বুঝছেন না। তাঁদের কারোর কাছে পাসপোর্টও পাওয়া যায়নি। এতে করে তাঁদের বিষয়ে বিস্তারিত এখনো জানা সম্ভব হয়নি। তাঁদের রিমান্ডে নিয়ে দোভাষী নিয়োগের মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানায় সিটিইউ।

তবে কয়েকজন পাকিস্তানি নাগরিক সিটিইউকে জানিয়েছেন, জুনে তাঁরা বাংলাদেশে এসেছেন। মহসীন নামে এক ব্যক্তি তাঁদের নিয়ে এসেছেন। তাঁদের সবার পাসপোর্ট ওই ব্যক্তির কাছে রাখা আছে।

সিটিইউ সদস্যরা জানান, ওই বিদেশিরা মূলত সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের সদস্য। নিজ নিজ দেশে অভিযানের মুখে টিকতে না পেরে তাঁরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাঁদের নেটওয়ার্কের সদস্যরা রয়েছে।

সিটিইউ সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার বিদেশিরা অনলাইনভিত্তিক কী ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল, সেই বিষয়ে এখনো তাঁদের কাছ থেকে কিছু জানা যায়নি। উদ্ধার করা ডিভাইসগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ফরেনসিক রিপোর্ট পেলে বিস্তারিত জানা যাবে।

খুলশীর যে আবাসিক ভবনে ৬৩ বিদেশি আস্তানা গেড়েছিলেন, সেই ভবনের মালিক দুবাইপ্রবাসী। বাসায় মালিকপক্ষের কাউকে পাওয়া পায়নি। কেয়ারটেকার মো. ইলিয়াস জানান, ভবন থেকে বিদেশিদের গ্রেপ্তার করার পর পুরো ভবনের দায়িত্ব নিয়েছে পুলিশ।

কক্সবাজারের আস্তানা

কক্সবাজার শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে রামুর হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট থেকে গত ২৫ আগস্ট চীনের পাঁচজন এবং তাইওয়ানের এক নাগরিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁরাও সংঘবদ্ধ অনলাইন প্রতারক চক্রের সদস্য। তাঁদের কাছ থেকে প্রথম দফায় আইএমইআই নম্বরের ১ হাজার ৯৩৮টি পুরোনো মডেলের আইফোন, দ্বিতীয় দফায় ৭০০ আইএমইআই নম্বরের আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউসহ বিভিন্ন ডিভাইস এবং চীনা পুলিশের দুটি র‍্যাংক ব্যাজ, পুলিশের লোগোযুক্ত টাই এবং চীনের দুটি জাতীয় পতাকা উদ্ধার করা হয়।

ওই ঘটনার মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে সেখানে থাকা চীনা ও তাইওয়ানের আরও অনেক নাগরিক রিসোর্টের পেছনের খোলা সৈকত এলাকা দিয়ে পালিয়ে যান। ওই রিসোর্ট থেকে উদ্ধার করা সরঞ্জামগুলোর মধ্যে ছয়টি ‘সাউন্ডপ্রুফ’ কক্ষও রয়েছে। এ ঘটনায় রামু থানার পুলিশ পরিদর্শক মিন্টু দত্ত বাদী হয়ে গ্রেপ্তার ছয়জনসহ ২৫০ থেকে ৩০০ জনের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা করেছেন।

রামু থানার পুলিশ জানায়, ‘বাবর আলী’ নামে এক ব্যক্তি গত এপ্রিল থেকে রিসোর্ট ভাড়া নেন। তিনি নিজেকে বাংলাদেশে একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় থাকা প্রতিষ্ঠানের মালিক বলে পরিচয় দেন। তবে পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) অনুসন্ধানে এ ধরনের কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে রিসোর্টের মহাব্যবস্থাপক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘বিদেশি নাগরিকেরা ভুয়া পরিচয় ও তথ্য দিয়ে রিসোর্ট ভাড়া নিয়েছিলেন, যা আমরা বুঝতে পারিনি। নিয়ম অনুযায়ী ভাড়াটে চুক্তিও সম্পাদন করা হয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা যায় সবকিছু ভুয়া।

এত আইফোন ও যন্ত্রপাতি কেন জড়ো করেছিল ওই চক্রটি, তা জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অভিযান) মো. অহিদুর রহমান বলেন, বড় ধরনের আর্থিক স্ক্যাম সম্পন্ন করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের এই সদস্যরা।

তবে কক্সবাজারে ধরা পড়া এই চক্রটির সঙ্গে চট্টগ্রামে চক্রটির এখনো কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানান নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ।

প্রতারক চক্র সম্পর্কে মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা মূলত অনলাইন প্রতারণার একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্দেশ্যেই সেখানে আস্তানা গেড়েছিলেন। এই অপরাধমূলক কার্যক্রমে তাঁদের সহায়তা করার জন্য দেশি একটি চক্রও সক্রিয় রয়েছে, যাদের সহযোগীরা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে রয়েছেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে।

মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ আরও বলেন, চীন, লাওস, কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অনলাইন প্রতারণা নিয়ে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক অভিযান চলার কারণে প্রতারকেরা বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছেন। তাঁদের সহায়তাকারী দেশি-বিদেশি আরও সহায়তাকারী রয়েছেন এবং চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁরা অবস্থান করছেন।

প্রচলিত অনলাইন প্রতারণা

সাইবার অপরাধ দমনে কাজ করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, অনলাইন শপিং ও ই-কমার্সের নকল সাইট বা পেজ এবং ফিশিং ও জালিয়াতিপূর্ণ যোগাযোগ, নকল ই-মেইল বা মেসেজের মাধ্যমে অনলাইন প্রতারণার আশ্রয় নেন প্রতারকেরা। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (ব্যাংক, বিকাশ, নগদ) বা কোনো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের ভুয়া লোগো বা নাম ব্যবহার করে মেসেজ পাঠানোর মাধ্যমে এটা করা হয়। এ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া ও অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, আইডি হ্যাকিং ও অর্থ দাবি, বিনিয়োগ ও লটারি প্রতারণা, ফেক ইনভেস্টমেন্ট স্ক্যাম, চাকরি ও প্রবাস বা কাজের প্রলোভনে ভুয়া চাকরির অফার এবং রোমান্স স্ক্যাম ও হানিট্র্যাপের মাধ্যমে প্রেমের ফাঁদ পেতে এই অনলাইন প্রতারণা করা হয়।