চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনকে কেন্দ্র করে আসলাম চৌধুরী ও কাজী সালাউদ্দিনের অনুসারীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, সংঘর্ষ এবং কয়েক দফা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে ওষুধ কোম্পানির এক বিক্রয়কর্মীসহ কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আজ মঙ্গলবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত পৌর সদর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
বিএনপির নেতা-কর্মী ও পুলিশ সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরী ও উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সালাহউদ্দিন একই সময়ে পৌর সদরের মুনস্টার কনভেনশন সেন্টারে সমাবেশের আয়োজন করেন। বিষয়টি পুলিশ প্রশাসনের নজরে এলে উভয় পক্ষকে পৃথক স্থান ও সময়ে সমাবেশ করার অনুরোধ জানানো হয়।
আসলাম চৌধুরীর অনুসারীরা সকাল সাড়ে ১১টা থেকে মুনস্টার কমিউনিটি সেন্টারে জমায়েত শুরু করেন। কাজী সালাউদ্দিনের অনুসারীরা পৌর সদরের হাসান গোমস্তা মসজিদ এলাকায় অবস্থান নেন।
আসলাম চৌধুরীর অনুসারীরা দুপুরের পর মিছিল নিয়ে হাসান গোমস্তা মসজিদ এলাকায় গেলে কাজী সালাউদ্দিনের অনুসারীদের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ সময় কয়েক দফা ককটেল বিস্ফোরণে পৌর সদর এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
কাজী সালাউদ্দিনের অনুসারীদের ওপর হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁদের নেতা-কর্মীরা দুপুর ২টার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বাঁশবাড়িয়া এলাকায় অবস্থান নেন। বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা মহাসড়ক অবরোধ করলে দূরপাল্লার শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। যানজট ধীরে ধীরে ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
কুমিরা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও কাজী সালাউদ্দিনের অনুসারী মো. শামসুদৌহা বলেন, কাজী সালাউদ্দিনের অনুসারীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে নেতা-কর্মীরা দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরে তাঁরা সড়ক থেকে সরে যান।
বার আউলিয়া হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক মিল্টন মণ্ডল বলেন, বিএনপির নেতা-কর্মীরা দুপুর ২টার দিকে বাঁশবাড়িয়া এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে উভয় লেনে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকেল ৪টার পর আটকে থাকা যানবাহন ধীরে ধীরে চলাচল শুরু করে। যান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে পুলিশ কাজ করছে।
দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, অভ্যন্তরীণ বিবাদের জেরে সীতাকুণ্ড বিএনপির রাজনীতি মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রদল ও যুবদলের সাবেক সভাপতি এবং উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সালাহউদ্দিনের অনুসারীরা।
কাজী সালাহউদ্দিনের অনুসারীরা বিকেলে সীতাকুণ্ডের ঐতিহ্যবাহী মুনস্টার ক্লাবের সামনে মহাসমাবেশ ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি পালনের কথা জানিয়ে গত ২৭ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে লিখিত চিঠি দেন। কর্মসূচি সফল করতে তাঁরা কয়েক দিন ধরে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে প্রস্তুতি সভা ও গণসংযোগ চালিয়ে আসছিলেন।
অন্য পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও কেন্দ্রীয় সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী এবং তাঁর অনুসারী উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব দাবিদার মোহাম্মদ মোরছালীন। আসলাম চৌধুরী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে বিজয়ী হলেও ঋণখেলাপির দায়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তাঁর সংসদ সদস্য পদের গেজেট স্থগিত থাকে। ওই পক্ষের অনুসারীরাও এক সপ্তাহ ধরে নিজস্ব বলয় থেকে সভা-সমাবেশ করছিলেন এবং একই স্থান ও সময়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন।
মোহাম্মদ মোরছালীন বলেন, ‘সীতাকুণ্ডে আসলাম চৌধুরীর বাইরে ভিন্ন কিছু চিন্তা করার কোনো সুযোগ নেই।’ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে সীতাকুণ্ডে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য কাজী সালাউদ্দিন ও তাঁর অনুসারীরা দায়ী বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কাজী সালাহউদ্দিন সমর্থিত কমিটির উপজেলা সদস্যসচিব কাজী মহিউদ্দিন বলেন, ‘মোরছালীন আসলে দলের বৈধ কোনো সদস্যসচিব নন। কোনো প্রভাবশালী নেতা বা ব্যক্তি কাউকে সদস্যসচিব বললেই তিনি বৈধ হয়ে যান না। সংগঠন চলে দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী। আসলাম চৌধুরী তাঁর নিজস্ব স্বার্থে গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা না করে পকেট কমিটি বানাতে পারেন না। কর্মীরা এটা কখনো মেনে নেবে না।’
কাজী মহিউদ্দিন আরও বলেন, উত্তর জেলা বিএনপি আগে যে আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দিয়েছিল, সেটিই এখনো বহাল আছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শান্তিপূর্ণভাবে পালনের আয়োজন করা হলেও আসলাম চৌধুরীর অনুসারীরা তা পণ্ড করতে তাঁদের নেতা-কর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছেন। হামলায় তাঁদের কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে আসলাম চৌধুরী ও কাজী সালাউদ্দিনের অনুসারীরা পৃথক কর্মসূচির আয়োজন করেন। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। একপর্যায়ে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় দুই পক্ষকে সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।