চট্টগ্রাম বন্দরে ২০ দিনের ব্যবধানে বহির্নোঙরে নোঙর করা তিনটি বিদেশি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। নাবিকদের জিম্মি করে জলদস্যুরা লুট করেছে কোটি টাকার মালামাল। এতে আতঙ্কে রয়েছেন জাহাজমালিক, শিপিং এজেন্ট ও নাবিকেরা। অভিযোগ রয়েছে, নির্বিঘ্নে ঘটছে এসব লুটপাটের ঘটনা। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
জাহাজে লুটপাট এবং হামলার প্রথম আলোচিত ঘটনাটি ঘটে চলতি বছরের ২৯ জুন দিবাগত রাতে। সাও টোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপের পতাকাবাহী সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ ‘এমভি হাই জু’ মধ্যরাতে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর চার্লি অ্যাংকরেজে পৌঁছায়। জাহাজটি সীতাকুণ্ডের ডায়নামিক শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য আমদানি করা হয়েছিল। ডাইনামিক শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, রাত প্রায় ১টা ৪০ মিনিটে ২০-২৫ জনের একটি জলদস্যু দল জাহাজে উঠে নাবিকদের জিম্মি করে ইঞ্জিন রুমে প্রবেশ করে। পরে তারা জাহাজের স্পেয়ার পার্টসসহ প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের বিভিন্ন সরঞ্জাম লুট করে নিয়ে যায়।
ডায়নামিক শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আরিফুল হাসান নয়ন বলেন, জলদস্যুরা জাহাজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ক্যাপ্টেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডকে বিষয়টি জানান। তবে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এর পরদিন অর্থাৎ ৩০ জুন চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর চার্লি অ্যাংকরেজে পৌঁছায় ‘এমটি আইরোস’ নামের আরেকটি জাহাজ। এটি আমদানি করেছে সীতাকুণ্ডের যমুনা শিপ ব্রেকার্স। আমদানিকারকের ভাষ্য, চার্লি অ্যাংকরেজে পৌঁছানোর পর জাহাজে থাকা মূল্যবান সরঞ্জাম আগেই লুট হয়। এর কিছু মালামাল সদরঘাট থানার বাংলাবাজার এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
খবর পেয়ে সদরঘাট নৌ পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের সরঞ্জাম উদ্ধার করে। যমুনা শিপ ব্রেকার্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ জাবেদ বলেন, ‘লুট হওয়া সরঞ্জামের মোট মূল্য অন্তত ৫ কোটি টাকা। পুলিশের সহযোগিতায় প্রায় ২ কোটি টাকার মালামাল উদ্ধার করতে পেরেছি।’ আইনি জটিলতার ভয়ে মামলা করা হয়নি বলে জানান তিনি।
সর্বশেষ ১৬ জুলাই ভোরে বহির্নোঙরে চার্লি অ্যাংকরেজে সিয়েরা লিওনের পতাকাবাহী ট্যাংকার ‘তাই শুয়েনে’ আসে। হংকং থেকে আসা জাহাজটির শিপিং এজেন্ট ‘বেন লাইন শিপিংয়ে’র মালিক মোশাররফ হোসেন বলেন, পাঁচটি কাঠের নৌকায় করে প্রায় ২০ জন জলদস্যু জাহাজে ওঠে। তিনি বলেন, নাবিকেরা যখন নোঙর ফেলতে ব্যস্ত ছিলেন, তখন কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা জাহাজে উঠে পড়ে। এক দল নাবিকদের নোঙর করার কাজ শেষ করতে বাধা দেয়, অন্য দল ডেক থেকে দামি মুরিং রোপ, ব্যাটারি ও অন্যান্য মূল্যবান সরঞ্জাম লুট করে।
মোশাররফ হোসেন বলেন, এ ঘটনার সময় জাহাজের ইন্দোনেশীয় ক্যাপ্টেন সঙ্গে সঙ্গে বেতারযোগে চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণকক্ষে বিষয়টি জানান। তবে কোস্ট গার্ড ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই জলদস্যুরা পালিয়ে যায়। একের পর এক হামলায় জাহাজমালিক, শিপিং এজেন্ট ও নাবিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রিফায়েত হামীম সর্বশেষ হামলার ঘটনা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, সর্বশেষ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে কোস্ট গার্ড এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কোস্ট গার্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, বহির্নোঙর এলাকায় ২৪ ঘণ্টাই একাধিক টহল দল দায়িত্ব পালন করে। তাঁর মতে, কোনো ঘটনার খবর পেলেই টহল দল ঘটনাস্থলে যায় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। তবে সময়মতো খবর না পেলে দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং জলদস্যুতা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন বলেন, হামলার শিকার জাহাজগুলো মামলা করতে গিয়ে নানা জটিলতার মুখে পড়ে। অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ দায় এড়ায় এবং কোস্ট গার্ড প্রায়ই দাবি করে যে তারা সময়মতো খবর পায়নি। তিনি বলেন, সর্বশেষ ঘটনায় হামলার সঙ্গে সঙ্গেই জাহাজ থেকে বার্তা পাঠানো হয়েছিল। তবুও কোস্ট গার্ড ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি করেছে। ততক্ষণে সবকিছু লুট হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কিংবা কোস্ট গার্ড—কেউই বন্দরের সীমার মধ্যে জলদস্যুতা দমনে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক বিদেশি নাবিক এখন এই বহির্নোঙরকে জলদস্যুপ্রবণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করেন।’