চট্টগ্রামে প্রায় ৮০ কোটি টাকার ঋণ আদায়ের অংশ হিসেবে পলাতক গার্মেন্টস ব্যবসায়ী নাজমুল আবেদিনের একটি ফ্ল্যাট বুঝে নিয়েছে ওয়ান ব্যাংক। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বুধবার (১৭ জুন) নগরীর খুলশী এলাকার ৬ নম্বর রোডে বে গ্রিন ভ্যালি ভবনের ২ হাজার ১৯০ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাটের দখল নেয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
ব্যাংক সূত্র জানা গেছে, ভবনটির দ্বিতীয় তলায় ফ্ল্যাটটি অর্থঋণ জারি মামলায় সংযুক্ত (অ্যাটাচমেন্ট) হওয়ার পর আদালতের নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাংকের অনুকূলে বুঝে নেওয়া হয়েছে। এ সময় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (সহকারী কমিশনার) সুব্রত হালদার, ওয়ান ব্যাংকের করপোরেট বিজনেস ইউনিট-চট্টগ্রামের এসএভিপি অভিজিৎ দাশসহ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নাজমুল আবেদিনের মালিকানাধীন নর্ম আউটফিট লিমিটেডের কাছে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ওয়ান ব্যাংকের পাওনা ছিল প্রায় ৫১ কোটি টাকা। ঋণ আদায়ে ওই বছর অর্থঋণ মামলা দায়ের করা হয়। ২০২৪ সালে মামলার রায় ব্যাংকের পক্ষে হওয়ার পর ২০২৫ সালে অর্থঋণ জারি মামলা করা হয়। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির কাছে ওয়ান ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
ব্যাংক ও শিল্প খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০২০ সালে চারটি ব্যাংকের প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ না করেই দেশত্যাগ করেন নাজমুল আবেদিন। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে অর্থঋণ মামলা ও চেক ডিজঅনারের অভিযোগে একাধিক মামলা দায়ের করে পাওনাদার ব্যাংকগুলো।
চট্টগ্রাম ইপিজেডভিত্তিক রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান এ অ্যান্ড বি আউটওয়্যার লিমিটেড, নর্ম আউটফিট লিমিটেড ও ক্লোদ প্লে লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন নাজমুল আবেদিন। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের মোট পাওনা ৪০০ কোটি টাকার বেশি।
এর মধ্যে এ অ্যান্ড বি আউটওয়্যারের কাছে ব্র্যাক ব্যাংকের পাওনা প্রায় ১০২ কোটি টাকা এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অফশোর ইউনিটের পাওনা প্রায় ৬০ কোটি টাকা। নর্ম আউটফিটের কাছে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পাওনা প্রায় ৭০ কোটি টাকা এবং ওয়ান ব্যাংকের পাওনা প্রায় ৮০ কোটি টাকা।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তুলনামূলক সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পেয়েছিল নাজমুল আবেদিনের প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা জামানত (সিকিউরিটি) না থাকায় এবং উদ্যোক্তার দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থানের কারণে পাওনা অর্থ আদায় নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেটের বাসিন্দা নাজমুল আবেদিন একসময় একটি বহুজাতিক ব্যাংকে চাকরি করতেন। পরে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমিয়ে সেখানকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৬ সালের দিকে চট্টগ্রাম ইপিজেডে পোশাক খাতের ব্যবসা শুরু করে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে কাঁচামাল আমদানি ও পরিচালন মূলধনের নামে বড় অঙ্কের ঋণ সুবিধা নেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ২০১৯ সালের পর থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধে অনিয়ম শুরু হয় এবং পরে তিনি দেশত্যাগ করেন। এ ছাড়া তাঁর একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্য খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। এই অভিযোগে ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটির সদস্যপদ বাতিলের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিজিএমইএকে চিঠি দিয়েছিল বলে জানা গেছে।
পাওনাদার ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, আদালতের মাধ্যমে সম্পত্তি সংযুক্ত ও দখলে নেওয়ার কার্যক্রম চলমান থাকলেও বিদেশে অবস্থানরত নাজমুল আবেদিনের কাছ থেকে পুরো পাওনা অর্থ আদায় করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।