চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনালসহ (সিসিটি) বন্দরের কোনো স্থাপনা দেশি-বিদেশি মালিকানায় ইজারা না দেওয়ার দাবিতে আজ সোমবার পদযাত্রা করেছে বন্দর রক্ষা কমিটি। আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড় থেকে বন্দর অভিমুখে যাত্রা শুরু হয়ে বারিক বিল্ডিং মোড়ে পুলিশি বাধার মুখে পড়ে পদযাত্রা কর্মসূচিটি। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ১৫ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের জুলাই হলে ‘বন্দর রক্ষা নাগরিক কনভেনশন’ আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার পদযাত্রার সমাপ্তি ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষার আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে শ্রমিক, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে এই কনভেনশন অনুষ্ঠিত হবে। দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জাতীয় সম্পদ রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
পদযাত্রা শুরুর আগে বাদামতলী মোড়ে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার। সঞ্চালনা করেন সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু।
সমাবেশে বক্তব্য দেন শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য তপন দত্ত, বন্দর সিবিএর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শ ম জামাল উদ্দিন, বাসদ (মার্ক্সবাদী) চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সদস্য দীপা মজুমদার, টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান, জাতীয়তাবাদী ডকশ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল বাতেন, সহকারী সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম ফরাজী, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুর রহমান মজুমদার, বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুর রহিম, হোটেল সেন্ট মার্টিন কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. মিজানুর রহমান এবং নির্মাণশ্রমিক দল চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি আব্দুল মন্নানসহ বিভিন্ন শ্রমিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা।
তপন দত্ত বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। এই বন্দরকে ঘিরেই দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ বিদেশি বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হলে তা দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমরা মনে করি, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, জাতীয় সম্পদকে ইজারা দিতে হবে।’
কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়, এটি দেশের ১৮ কোটি মানুষের সম্পদ। শ্রমিকদের মতামত উপেক্ষা করে বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। অতীতেও শ্রমিকেরা দেশের স্বার্থ রক্ষায় আন্দোলন করেছেন, ভবিষ্যতেও প্রয়োজন হলে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার আরও বলেন, বন্দরের আধুনিকায়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই আধুনিকায়ন হতে হবে রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দর ব্যবস্থাপনা তুলে দিলে দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তাই সরকারকে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তসলিম হোসেন সেলিম বলেন, বন্দরের শ্রমিকেরাই দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সচল রেখেছেন। শ্রমিকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলে শ্রমিকসমাজ তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড এবং জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বন্দরের যেকোনো স্থাপনা দেশি-বিদেশি মালিকানায় ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ দেশের জনগণ মেনে নেবে না। বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূরীকরণ এবং দক্ষ জনবল নিয়োগের দাবি জানান তাঁরা। একই সঙ্গে জাতীয় সম্পদ রক্ষায় সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সমাবেশ শেষে ‘বন্দর বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’, ‘এনসিটি-সিসিটি ইজারা দেওয়া চলবে না’, ‘জাতীয় সম্পদ রক্ষায় জনগণ ঐক্যবদ্ধ’ এবং ‘বন্দর রক্ষার আন্দোলন সফল করো’ স্লোগান-সংবলিত ফেস্টুন ও ব্যানার নিয়ে অংশগ্রহণকারীরা বন্দর অভিমুখে পদযাত্রা করেন।