হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

লালদিয়া টার্মিনাল চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাবে রূপান্তরের ভিত্তি গড়বে: অর্থমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

পতেঙ্গায় এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী। ছবি: আজকের পত্রিকা

লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল বাংলাদেশের লজিস্টিকস, বাণিজ্য সহজীকরণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। একই সঙ্গে এটি চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাবে পরিণত করার ভিত্তি তৈরি করবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

আজ রোববার (৩০ আগস্ট) চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় লালদিয়া চরে এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার সরকারের লক্ষ্যে লালদিয়া টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, ‘লালদিয়া পোর্টের গুরুত্ব হচ্ছে, এটি লজিস্টিকস, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং এই অঞ্চল ও বাংলাদেশের উন্নয়নে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।’

চট্টগ্রামে আরও কয়েকটি বন্দর ও লজিস্টিকস সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এর পাশাপাশি ফ্রি ট্রেড জোন ও আরও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামকে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক রাজধানী হওয়ার প্রত্যাশা করা হয়েছে। বাণিজ্যিক রাজধানী শুধু ঘোষণা করে হওয়া যায় না। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই এটি গড়ে উঠতে হয়।

পতেঙ্গায় এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী। ছবি: আজকের পত্রিকা

বন্দর, লজিস্টিকস ও শিল্প অবকাঠামোর সম্প্রসারণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে শহরটির অবদান আরও বাড়াবে বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এ বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতি বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর আস্থার প্রতিফলন। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলে বাণিজ্য সম্প্রসারণে চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রাবিউল আলম বলেন, লালদিয়া টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বাংলাদেশের বন্দর ও লজিস্টিকস খাতের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। তিনি বলেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও আধুনিক টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন যুগে প্রবেশ করবে। আমাদের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হবে। সে দিক থেকে আজকের অনুষ্ঠান জাতি ও দেশের জন্য অবশ্যই সুখবর।

ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস, এপি মোলার-মার্স্ক গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় টার্মিনালটি নির্মাণ করছে।

বছরে প্রায় ১০ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করবে লালদিয়া

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রমেশ ডেভিড বলেন, তিন বছরের মধ্যে টার্মিনালটি বিশ্বের অন্যতম আধুনিক কনটেইনার টার্মিনালে পরিণত হবে। তিনি বলেন, টার্মিনালটিতে প্রায় ৬০০ মিটার দীর্ঘ জেটি এবং সাতটি শিপ-টু-শোর গ্যান্ট্রি ক্রেন থাকবে। এ ছাড়া থাকবে ৩০টি রিমোটলি পরিচালিত গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং প্রায় ৪৫টি বৈদ্যুতিক ট্রাক।

পুরোপুরি চালু হলে টার্মিনালটি বছরে প্রায় ১০ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে পারবে। এর ফলে বাংলাদেশের বর্তমান কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়বে বলে জানান ডেভিড। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত এটিই এই দেশের বন্দর খাতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। প্রকল্পটিতে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ডেভিড বলেন, এটি বাংলাদেশের বন্দর খাতে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) যুক্ত প্রথম সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব প্রকল্প এবং দেশে এ ধরনের প্রথম গ্রিনফিল্ড বন্দর প্রকল্প।

নতুন শিপিং সার্ভিস ও বড় জাহাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি করবে লালদিয়া টার্মিনাল। এর ফলে রপ্তানি বাড়তে পারে এবং বিনিয়োগের পরিমাণের তুলনায় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য গুণিতক প্রভাব তৈরি হবে বলে জানান তিনি।

এপিএম টার্মিনালসের তথ্য অনুযায়ী, লালদিয়া টার্মিনালকে শূন্য-নিঃসরণ (জিরো-এমিশন) সুবিধা হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা ব্যবহারের মাধ্যমে টার্মিনালটির কার্যক্রম কার্বন নিরপেক্ষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রকল্পটি সরাসরি ৫০০টির বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি আরও ৫০০ বা তার বেশি পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হবে। টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে জানান ডেভিড। তিনি বলেন, এপিএম টার্মিনালস উন্নত বন্দর প্রযুক্তিতে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেবে। পাশাপাশি রিমোটলি নিয়ন্ত্রিত ক্রেন পরিচালনায় নারীদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে।

প্রকল্প এলাকায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা বজায় রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে এপিএম টার্মিনালসের। টার্মিনালটির সঙ্গে ৩০ বছরের সম্পৃক্ততার পুরো সময়জুড়ে কোম্পানিটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করবে বলে জানান ডেভিড।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নেদারল্যান্ডসের প্রতিনিধিরা, নৌপরিবহন সচিব জাকারিয়া, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতা, সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।