১১ দলীয় ঐক্যের ডাকা লংমার্চের গন্তব্য চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের জনসভায় বক্তব্যে জাতীয় সংসদকে ‘অকার্যকর’ দাবি করে প্রধানমন্ত্রীকে এর দায় দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। এ সময় সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি।
শনিবার রাতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চ নগরীর লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে আয়োজিত জনসমাবেশে একে একে বক্তব্য রাখেন জোটের শরিক দলের নেতারা।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ তুলে বলেন, এই সমস্যা-সংকট আপনি তৈরি করেছেন। আপনি সংসদকে কার্যকর করেননি। সংসদ কার্যকর না হওয়ার কারণে আজ আন্দোলন রাজপথে গড়িয়েছে। আপনি যদি প্রথমে গণভোটের গণরায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদ করতেন, তাহলে সেই সংবিধান পরিষদে আমরা আলোচনা করতে পারতাম। কিন্তু আপনি সেটা না করে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। গণভোটের গণরায় মেনে না নিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।
বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের কোনো বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না দাবি করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘তারপরও দেশের স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে আমরা সংসদে গিয়েছি এবং আছি। কিন্তু আপনি কি করেছেন- বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের আসনে কোনো বরাদ্দ দিচ্ছেন না। এসব আসনে আপনি বিএনপির সংরক্ষিত মহিলা এমপিদের দায়িত্ব দিয়েছেন। জনগণের নির্বাচিত এমপিদের কাজ করতে দিচ্ছেন না। দেশের অন্য সকল প্রতিষ্ঠানের মতো এই সংসদকে একটি একদলীয় প্রতিষ্ঠান ও সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছেন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘স্বৈরতন্ত্রের মূল হোতা’ উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আর এই সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের মূল হোতা হলো আপনাদের এলাকার, এই চট্টগ্রামের সালাহউদ্দিন সাহেব। উনি একাই সংসদ চালায়। উনি যদি একাই সংসদ চালায়, তাহলে বাকি সংসদ সদস্যদের ও বিরোধী দলের সংসদে যাওয়ার তো প্রয়োজন নেই। উনি যেহেতু সকল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিতে পেরেছে, তাহলে বিরোধী দলের দায়িত্বও না হয় তিনিই পালন করুক। আমরা রাজপথে জনগণের সঙ্গেই থাকি।’
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আপনি তো কথা বলা বন্ধ করে দিয়ে সালাহউদ্দিন সাহেবকে কথা বলতে দিয়েছেন। কিন্তু সালাহউদ্দিন সাহেবের কথা জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে।’
এনসিপির এ শীর্ষ নেতা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমরা এই অধিবেশনে এখনো সংসদে আছি। পরের অধিবেশনে যাব কি না, তা এখনো নিশ্চিত নই। কারণ জনগণের অধিকার, জনগণের সমাধান যদি সংসদ থেকে না আসে, তাহলে এই সংসদ কোনো কাজেই আসবে না। সরকার-রাজপথ একাকার হয়ে যাবে! আপনার জন্য আমরা পাঁচ বছর অপেক্ষা করব না। পতিত স্বৈরাচার আসলে আপনিও কিন্তু তা থেকে রক্ষা পাবেন না।’
আহ্বান জানিয়ে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘এটা হওয়ার আগেই হয় আপনি জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন, অথবা ঐক্যবদ্ধভাবে কীভাবে দেশ পরিচালনা করা যায়- সেই রাস্তা খুঁজে বের করুন।’
জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার তাঁর বক্তব্যে বলেন, ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম, জুলাই আন্দোলনের রক্তের স্মৃতি বিজড়িত বীর চট্টলায় লংমার্চ নিয়ে আমরা কেন এসেছি, কারণ আমরা চাই কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী পথে যারা হাঁটছে সেই পথ থেকে তাঁদের ফেরাতে। চট্টগ্রাম থেকে নতুন বিপ্লবের সূচনা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারকে চলমান পার্লামেন্টে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডেকে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। যতক্ষণ পূরণ না হবে এই লংমার্চ ততক্ষণ থামবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ও ১১ দলীয় জোটের শরিক নেতা আল্লামা মামুনুল হক বলেছেন, আজ আন্দোলনের তৃতীয় ধাপের সূচনা হলো। এই গণসমুদ্র থেকে পরিষ্কার ঘোষণা দিতে চাই- গণভোটের আগে যদি সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে আমাদের সংবিধান সংস্কারের আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত হতে পারে।
১১ দলীয় জোটের এই নেতা বলেন, আমরা কোনো হাসি-তামাশা করতে দেবো না। আমাদের আন্দোলনকে ললিপপ দেখিয়ে ভুলিয়ে রাখা যাবে না। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা পরিষ্কারভাবে বলেছেন, শুধু সংবিধান সংস্কার কমিটিতে আসার কথা বলে আমাদের আন্দোলন থামানো যাবে না।
এলডিপির চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমেদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে আয়োজিত জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন—এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন প্রমুখ।
এর আগে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ শনিবার সকালে ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রামের অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন ও জুলাই গণহত্যার বিচারসহ ৬ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে এই লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়।
পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী জোটের নেতৃবৃন্দ নারায়ণগঞ্জের কাচপুর ব্রিজ, কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহিপাল, চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ডে পথসভা শেষে লংমার্চটি নগরীর লালদীঘি ময়দানে পৌঁছে।