হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

গ্যাস-সংকটে কর্ণফুলী-আনোয়ারা রুটে পরিবহন নৈরাজ্য

মো. ইমরান হোসাইন,কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম)

উপজেলার বড়উঠান ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের অপেক্ষায় সিএনজিচালিত যানবাহন। আজ শুক্রবার বিকেলে তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

দেশে চলমান গ্যাস-সংকটকে ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও আনোয়ারা রুটে গণপরিবহনে ভোগান্তি বেড়েছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাসে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন চালকেরা, ফলে সড়কে যানবাহনও কমে গেছে।

আজ শুক্রবার বিকেলে উপজেলার বড়উঠান থেকে মইজ্জারটেক পর্যন্ত পাঁচটি ফিলিং স্টেশনে সরেজমিনে দেখা যায়, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কর্ণফুলীর তিনটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও এই সারি দেড় থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেয়ে অনেক সিএনজিচালিত অটোরিকশা সড়কে নামতে পারছে না।

সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংকটে বিকল্প গণপরিবহন হিসেবে বাসে যাত্রীদের উপচে পড়া চাপ দেখা গেছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। তেলচালিত ছোট যানবাহনগুলোতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ কর্মদিবসে বাড়ি ফেরা মানুষেরা বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত টাকা গুনে যাতায়াত করেছেন।

কর্ণফুলীর শাহ আমানত সেতু এলাকায় আনোয়ারার চাতরী চৌমুহনীর গাড়ির জন্য অপেক্ষারত যাত্রী মো. মিজানুর রহমান বলেন, পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও ঠিকমতো গ্যাস পাচ্ছেন না চালকেরা। আর এই সুযোগে চালকেরা ৫০ টাকার জায়গায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা চাইছেন। না দিয়েও উপায় নেই, কারণ রাস্তায় গাড়ি কম।

দুপুরে বড়উঠান এলাকার ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমাণ সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ সোহেল বলেন, ‘সকাল ১০টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। বিকেল ৩টা পর্যন্ত গাড়ি গ্যাসপ্যাম্পের সামনে নিতে পারিনি। গ্যাসের চাপ এত কম যে, একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তিন-চার গুণ বেশি সময় লাগছে। এখন পাম্প বন্ধ। আবার চালু হবে রাত ৯টার পর, এতক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করছি।’

চাতরী চৌমুহনী বাজারে যাত্রীর অপেক্ষায় থাকা সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক হাফিজ মিয়া অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে বলেন, ‘সকাল থেকে বিকেলে পর্যন্ত অপেক্ষা করেও গ্যাস নিতে পারিনি। গ্যাসের পাশাপাশি তেল ব্যবহারের বিকল্প সুবিধা থাকায় তেলের ওপর ভর করে সড়কে নেমেছি। সংসার আর গাড়ির মালিকের টাকা জোগাড় করতে নিরুপায় হয়ে ১০ টাকা বেশি নিচ্ছি।’

যাত্রী ইকবাল তালুকদার বলেন, সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা কমে যাওয়ায় চালকেরা বাড়তি ভাড়া চাইছেন। বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিয়ে যেতে হচ্ছে। গ্যাস-সংকটের জরিমানা এখন যাত্রীদের দিতে হচ্ছে।

চালকদের ভাষ্য, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় হওয়ায় দৈনিক ট্রিপের সংখ্যা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। ফলে রুজিরোজগার ধরে রাখতে বাধ্য হয়েই ভাড়া কিছুটা বেশি নিতে হচ্ছে।

পরিবহনসংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে সড়কের এই নৈরাজ্য আরও বাড়বে। একদিকে পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে চালকদের আয় কমছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত ভাড়া গুনে বিপাকে পড়ছেন।

সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের গ্যাসের সিংহভাগ চাহিদা নির্ভর করে বঙ্গোপসাগরের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি ভাসমান এলএনজি (লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস) টার্মিনালের ওপর। দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রের সরবরাহ দিয়ে চট্টগ্রামের এই সুনির্দিষ্ট পরিকাঠামোগত চাহিদা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। মহেশখালীতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি ও দেশের সামিট গ্রুপ পরিচালিত দুটি ভাসমান টার্মিনাল জাতীয় গ্রিডে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে থাকে।

গত ২১ জুলাই মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালে হঠাৎ অগ্নিকাণ্ডের পর যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সিঙ্গাপুরের কারিগরি বিশেষজ্ঞদের একটি যৌথ দল তা মেরামতের উদ্যোগ নেয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিক সচল হলেও চাপ স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়নি। এ কারণেই দেশে গ্যাসের সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে বলে জানা গেছে।