বান্দরবানের দুর্গম আলীকদম উপজেলার চৈক্ষ্যং এলাকায় ব্যাপকভাবে বন উজাড়ের ঘটনা ঘটছে। প্রশাসনের উদাসীনতার সুযোগে প্রভাবশালীরা প্রায় ২০০ একর বনভূমি ধ্বংস করে কাঠ পাচার করছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। এদিকে বন উজাড়ের ফলে কিছু এলাকায় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, কয়েক মাস ধরে আলীকদমের চৈক্ষ্যং ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পামিয়া ম্রোপাড়া, তন্তুইপাড়া, নামচাকপাড়া, কাকইপাড়া, আদুইপাড়াসহ আশপাশ এলাকার অন্তত ২০০ একরজুড়ে বন উজাড় করে চলেছে পানবাজারের ইসমাইল ওরফে লাল ইসমাইল, লংলেইন ম্রোসহ একাধিক বনখেকো চক্র।
গাছ কাটার শ্রমিকদের মাঝি মো. ইসমাইল জানান, তাঁরা আবুহান, মো. ইসমাইল সওদাগরের অধীনে গাছ কাটার কাজ করছেন, একটি বড় ট্রাক দিয়ে দৈনিক দুবার কাঠ পরিবহন করা হয়।
আরও জানা যায়, বনের গাছ উজাড় করতে পাহাড়ের বুক চিরে পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে রাস্তা, ভরাট করা হয়েছে একাধিক ঝিরিও। আর এসব গাছ লামা বন বিভাগ কর্তৃক অনুমতিপত্র বা জোত পারমিটের কাগজ দেখিয়ে বৈধতার আড়ালে কলার ঝিরি নামক বাইপাস রাস্তা ব্যবহার করে নিয়মিত পাচার করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। কাটা গাছের অবশিষ্ট অংশ আলীকদমের বিভিন্ন অবৈধ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। বন উজাড়ের ফলে প্রতিনিয়ত চোখে পড়া হরিণ, শূকর, ভালুক, বনমোরগসহ বন্য প্রাণী বিলুপ্তির পথে।
নামচাকপাড়ার মেন রাও ম্রো বলেন, দুই বছরে আগে এখানে বন্য প্রাণীর বিচরণ থাকলেও এখন প্রাকৃতিক বনও নেই, প্রাণীও নেই, সামনে কিছুই থাকবে না।
ব্যাঙ ঝিরিটি শুকিয়ে যাওয়ার ফলে এর ওপর নির্ভরশীল ওই এলাকার পামিয়া, তন্তুই, নামচাক, কাকই, আদুইপাড়াসহ অন্তত পাঁচটি ম্রোপাড়ার মানুষ তীব্র পানিসংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। পোলা ব্যাঙ ঝিরির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করে পাহাড় কেটে ট্রাক চলাচলের উপযোগী রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। রাস্তার দুই পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আকারের ছোট-বড় গাছের গুঁড়ি। দুই বছর ধরে পাড়ার প্রাকৃতিক বন থেকে ৩০ জন শ্রমিক মাতৃগাছ কেটে পাচার করলেও বন বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আদুইপাড়ার কার্বারি কামপ্লাত ম্রো বলেন, ‘পাহাড়ি ঝিরির পানির ওপর সাত-আটটি পাড়ার মানুষ নির্ভরশীল। বৃক্ষনিধনের ফলে ঝিরি এখন মরা, এখন আমরা পানির জন্য হাহাকার করছি, অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি।’
ব্যাঙ ঝিরি শুকিয়ে গেছে, পাঁচটি পাড়ার ম্রো জনগোষ্ঠীর মানুষ তীব্র পানিসংকটে। দুই বছর আগে বড় বড় গাছ ছিল, বন ছিল, বনের মধ্যে ভালুক, হরিণ, বন শূকরসহ নানা প্রজাতির বন্য পশুপাখি ভরপুর ছিল। এখন বনও নেই পশুপাখিও নেই। অনেক গাছ অর্ধেক কেটে ফেলে রাখা হয়েছে, যেগুলোর আনুমানিক দৈর্ঘ্য ৬০ থেকে ১০০ ফুট এবং প্রস্থ ১০ থেকে ১৫ ফুট। বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে বনের এই ধ্বংসযজ্ঞ চলছে বলেও দাবি করেন এলাকাবাসী।
গাছ কাটায় নিয়োজিত শ্রমিক শামসুল আলম জানান, ১৯ দিন ধরে গাছ কাটার কাজ করছেন তাঁরা। চকরিয়া থেকে আসা আরেক দল শ্রমিক দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে কয়েক মাস ধরে কাজ করছেন, কয়েকটি গ্রুপ এখানে গাছ কাটছে।
পামিয়াপাড়ার মেন চং ম্রো বলেন, ‘আগে ব্যাঙ ঝিরিতে প্রচুর পানি ও মাছ-কাঁকড়া ছিল। এখন পানি শুকিয়ে গেছে। আমরা এখন নিরাপদ পানির চরম সংকটে আছি।
লুংলেই ম্রো দাবি করেন, তাঁর বাবা চাহ্লা ম্রো ৫০ একর প্রাকৃতিক বন ৪০ হাজার টাকায় পাঁচ বছরের জন্য ইসমাইল সওদাগরের কাছে ইজারা দেন। তবে ইসমাইল বন বিভাগ ও প্রশাসন “ম্যানেজ” করার আশ্বাস দিয়ে মামলা-মোকদ্দমার ভয় উপেক্ষা করে প্রায় ২০০ একর এলাকা থেকে গাছ কেটে নিচ্ছেন।’
তবে ইসমাইল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি গাছ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন, তবে ওই এলাকা থেকে কিছু লাকড়ি কিনেছেন, যা তামাকচুল্লিতে সরবরাহ করেন।
লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এই বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে ঘটনাটি তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।