হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

সাগরপাড়ে বিষাক্ত সকাল

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম ও সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি

শিপইয়ার্ডে জাহাজভাঙার কাজ করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন কর্মীরা। সেখান থেকে হতাহতদের সরিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। গতকাল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী এলাকায়। ছবি: এএফপি

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারীতে একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় গ্যাস বিষক্রিয়ায় অন্তত ৯ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন দুই শ্রমিক।

গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার ভাটিয়ারী স্টেশন রোডসংলগ্ন সাগর উপকূলে অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। জাহাজভাঙা শিল্পের ৬৬ বছরের ইতিহাসে এক দিনে এত শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিহত ৯ শ্রমিক হলেন মো. রানা (২৫), মো. ইদ্রিস (৩০), মো. সুজন (৩৮), পলাশ জলদাস (৩০), সানি জলদাস (২২), দুই সহোদর ভাই মনসুর আলী (৪০), নাসির উদ্দিন (৩৮), মতিউর রহমান (২০) ও হাবিবুর রহমান (৫০)।

নিহতদের মধ্যে পলাশ ও সানি জলদাসের বাড়ি সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের ভাটিয়ারী শনি ঠাকুরবাড়িসংলগ্ন জেলেপাড়া এলাকায়। দুই সহোদর মনসুর ও নাসির উদ্দিনের বাড়ি একই ইউনিয়নের মৌলভীপাড়া এলাকায়। রানার বাড়ি গাইবান্ধায়। অন্যদের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি।

নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পরে আহত শ্রমিকদের উদ্ধার করে কারখানার ভেতরে এক ঘণ্টার অধিক সময় ফেলে রাখা হয়। ঘটনার পর আহতদের চিৎকার শুনে তাঁরা ছুটে গেলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ গেটে তালা ঝুলিয়ে রাখে। বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি জানিয়ে তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের চলে যেতে বলে। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়ে কারখানার গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।

কারখানা কর্তৃপক্ষ ঘটনা ধামাচাপা দিতে আহতদের যথাযথ চিকিৎসা না দেওয়ায় তাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন বলে অভিযোগ স্বজনদের।

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, হতাহতের ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা ওই কারখানায় ভাঙচুর চালায়। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

স্থানীয় জেলেরা জানান, গ্যাসের তীব্রতা ব্যাপক ছিল। গ্যাসের গন্ধের কারণে তাঁরা কারখানাসংলগ্ন খালে মাছ ধরার নৌকা ভেড়াতে পারেননি। খাল থেকে আধা কিলোমিটার দূরে নৌকা ভেড়াতে হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকালে জাহাজভাঙা কারখানায় শ্রমিকদের চিৎকার শুনে ছুটে যান তাঁরা। এই সময় হতাহত শ্রমিকদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখে বেশ কিছু স্থানীয় বাসিন্দা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তারা ওই কারখানায় ভাঙচুর চালান। ঘটনার কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম হতাহতের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সাগরে জোয়ারের কারণে তাঁরা উদ্ধারকাজ বন্ধ রেখেছেন। জোয়ারের পানি নেমে গেলে আবারও উদ্ধারকাজ চালানো হবে। নিহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তৌফিকুল ইসলাম আরও জানান, যে জাহাজটি কাটা হচ্ছে, ওই ধরনের জাহাজগুলো আগে গ্যাসমুক্ত করে তারপর কাটতে হয়। কিছু কিছু ট্যাংকে ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড থাকতে পারে। এগুলো খুবই বিষাক্ত। কারখানা কর্তৃপক্ষ ট্যাংক গ্যাসমুক্ত না করে কাটার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল খুবই দুর্বল।

এই বিষয়ে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় অসাবধানতাবশত গ্যাস লিকেজের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকেই সরকারি নিয়ম মেনে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশ সুপার (এসপি) মাহমুদা বেগম গতকাল বিকেলে জানান, নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) মর্গে রয়েছে। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিপইয়ার্ডে জাহাজভাঙার কাজ করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে মারা যাওয়া এক কর্মীর বাড়িতে মাতম। গতকাল সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী এলাকায়। ছবি: এএফপি

তদন্ত কমিটি, ক্ষতিপূরণের ঘোষণা

নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকারস অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) কর্তৃপক্ষ। বিএসবিআরএ সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন জানান, নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

দুর্ঘটনার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিএসবিআরএর তরফে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এটার পাশাপাশি চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনের পক্ষে বিশেষজ্ঞ টিমের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

এদিকে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ/জাহাজ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধের নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসআরবি)। গতকাল বেলা ৩টা ৫৭ মিনিটে বিএসআরবির মহাপরিচালক শফিউল আলম তালুকদার এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করেন। শফিউল আলম তালুকদার জানান, পরবর্তী সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত ওই ইয়ার্ডে যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। বার্তায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই আদেশ যথাযথভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালে তিন দফায় আসে নিথর দেহগুলো

গতকাল দুপুর ১২টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত তিন দফায় অ্যাম্বুলেন্সে করে নিথর দেহগুলো আনা হয় চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। একে একে দুই সহোদরসহ ৯ জনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক; যাঁদের শরীরে কোনো ক্ষত ও পোড়ার দাগ ছিল না। চিকিৎসকেরা প্রাথমিকভাবে বলেছেন, বিস্ফোরণজনিত আঘাত ও বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে।

মরদেহগুলো পরে হাসপাতালের মর্গে ঠাঁই পায়। হাসপাতালে খোঁজ নিতে এসে অনেকেই প্রিয়জনের নিথর দেহ মর্গে পেয়ে যান।

খবর পেয়ে চমেক হাসপাতালে ছুটে আসেন নিহত মনসুরের ভগ্নিপতি মো. মহিউদ্দিন। কান্নায় ভেঙে পড়ে মহিউদ্দিন বলেন, মাত্র কয়েক দিন আগেও কারখানায় কাজ করতে কষ্ট হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন মনসুর। এমনকি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথাও বলেছিলেন।

তাঁদের মধ্যে খোকন ও রানার বাড়ি গাইবান্ধা এবং ইদ্রিস জামালপুরের বাসিন্দা, বাকিরা সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।

১০ বছরে নিহত ১০৪ শ্রমিক

জাহাজভাঙাশিল্পে একের পর এক দুর্ঘটনায় গত ১০ বছরে মারা গেছেন ১০৪ শ্রমিক। আহত হয়েছেন আরও কয়েক শ। এক দিনে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক মারা গেলেন এবার। জাহাজভাঙা শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের (ইপসা) অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ আলী শাহীন এই তথ্য দিয়েছেন।

এদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে জাহাজভাঙাশিল্পে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৫০ জন শ্রমিক। গতকালের ঘটনায় ৯ শ্রমিক মারা যান। এ নিয়ে চলতি বছর দুই ঘটনায় প্রাণ হারালেন ১২ শ্রমিক।

নিয়মের বালাই নেই

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকারস অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) তথ্যমতে, বর্তমানে ৩০টি গ্রিন শিপইয়ার্ড রয়েছে। আরও ৩৫-৪০টি ইয়ার্ড রয়েছে। যেগুলোকে গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। একটি গ্রিন শিপইয়ার্ড গড়ে তুলতে কমপক্ষে ৭০-১০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হয়। ১৯৬০ সালে ঘূর্ণিঝড়ে আটকে পড়া জাহাজ কাটার মাধ্যমে জাহাজভাঙাশিল্পের ভিত্তি গড়ে ওঠে। বাণিজ্যিকভাবে জাহাজভাঙা শুরু হয় আরও পরে—১৯৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জাহাজ ‘আল আব্বাস’ কাটা থেকে। কর্ণফুলী মেটাল ওয়ার্কস ১৯৭৪ সালের দিকে বাণিজ্যিকভাবে জাহাজ ভাঙার কাজ শুরু করে। কালক্রমে সীতাকুণ্ড উপকূলে গড়ে ওঠে দেশের প্রথম ও একমাত্র জাহাজভাঙাশিল্প।

তবে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও শ্রমিকনেতারা বলছেন, গ্রিন শিপইয়ার্ডের অধিকাংশই নামকাওয়াস্তে গ্রিন। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি থেকে এসব কারখানা অনেক দূরে। এই কারণেই বারবার দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের প্রাণ যায়।

জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত জানান, শ্রমিকেরা এখনো চরম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। যার প্রমাণ গতকালের ভয়াবহ দুর্ঘটনা। সরকার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি এই খাতে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। শ্রমিকদের নিয়মের চেয়ে বেশি সময় কাজ করানো হলেও উপযুক্ত মজুরি দেওয়া হয় না। বন্ধের দিনেও কাজ করানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে শ্রম আইন মানা হচ্ছে না। নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকলেও তা নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করা হয় না। দুর্ঘটনা ঘটলে দায় এড়ানোর প্রবণতা দেখা যায় সবার।

মামলার এক মাসের মাথায় দুর্ঘটনা

এদিকে একাধিকবার তাগিদ দেওয়ার পরও শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার অভিযোগে গত ১৫ জুলাই কারখানাটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)। কিন্তু এরই মধ্যে ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। এই বিষয়ে চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, ‘ওই শিপইয়ার্ডে গিয়ে কিছু ব্যত্যয় দেখতে পান আমাদের কর্মকর্তারা। এরপর এ বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌস স্টিলকে একটি নোটিশ দেওয়া হয়। এতে কোনো কাজ না হওয়ায় গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে কারখানাটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।’ এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষের গাফিলতির বিষয়টি স্পষ্ট বলেও জানান তিনি।

প্রাণহানি বাড়ার যত কারণ

শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বারবার দুর্ঘটনা ঘটার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাব, বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি ও অব্যবস্থাপনা, পুরোনো জাহাজ কাটার আগে জমে থাকা গ্যাস বা দাহ্য পদার্থ সঠিকভাবে অপসারণ না করা এবং শ্রমিকদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম না দেওয়ায় এসব প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা বারবার ঘটে চলেছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিধি বা কমপ্লায়েন্স ঠিকমতো না মানা ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, কর্তৃপক্ষের অবহেলা, দুর্বল তদারকি এবং জরুরি চিকিৎসার উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকাও এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দায়ী বলছেন শ্রমিকনেতা তপন দত্ত ও ইপসার কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী শাহীন।