হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

কর্ণফুলী টানেল মোড়ে দুর্ঘটনা

‘মা তো প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরত, আজ কেন আসছে না’

কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি 

আনোয়ারা উপজেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের করিডরে বসে মায়ের কথা বলছিল কিশোর বিজয় দত্ত। ছবি-আজকের পত্রিকা

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বাইরে করিডরের এক কোণে বসে ‘মা...মা...’ বলে চিৎকার করে কাঁদছিল ১৫ বছরের কিশোর বিজয় দত্ত। তার কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছিল হাসপাতালের চারপাশ। উপস্থিত লোকজনের চোখও তখন ভিজে উঠছিল। একটু পরপর বিলাপ করে বিজয় বলছিল, ‘এমন তো কখনো হয়নি, মা তো প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতো। আজ কেন আসছে না? আমার মা কই?’

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রামের আনোয়ারার কর্ণফুলী টানেল সংযোগ সড়ক মোড়ে যাত্রীবাহী বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত কলি দত্তের (৩৫) ছেলে বিজয়। কলি দত্ত কোরিয়ান ইপিজেডের (ইয়াংওয়ান) পোশাকশ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রতিদিনের মতো কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে দুর্ঘটনায় তিনি প্রাণ হারান। দুর্ঘটনায় আরও এক নারী নিহত এবং অন্তত ২১ জন আহত হন।

দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া বিজয় দত্ত বলে, ‘মা সকালে আমাদের জন্য দিনের সব খাবার রান্না করে দিয়ে অফিসে যেত। সারা দিনের পরিশ্রমের পর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেই আবার শুরু হতো সংসারের কাজ। ৭-৮ বছর ধরে আমাদের জন্য এই হাড়ভাঙা খাটুনি করে যাচ্ছেন। মা তো কিছু সময়ের জন্য আমাদের ছেড়ে বাইরে থাকে। একেবারে তো কখনো চলে যায়নি। আজ কেন ফিরল না? আমাদের কেন এখানে আসতে হলো!’

দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট বিজয় আনোয়ারা বারখাইন ঝি. বা. শি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে। বড় ভাই সৈকত দত্ত কলেজে ভর্তি হলেও এখন পড়াশোনা থেকে কিছুটা দূরে সরে গেছে। বাবা কাজল দত্ত পেশায় একজন প্রান্তিক কৃষক। নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারের হাল ধরতে এবং দুই ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে কলি দত্ত পোশাক কারখানায় কঠোর পরিশ্রম করতেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটি এখন দিশাহারা।

হাসপাতালের সামনে স্তব্ধ হয়ে বসেছিলেন কলি দত্তের বৃদ্ধ বাবা। ছলছল চোখে তিনি বলেন, ‘কলি অনেক কষ্ট করে সংসারটা আগলে রাখছিল। কীভাবে কী ঘটল, আমি এখনো মাথায় নিতে পারছি না। শুধু শুনেছি, আমার মেয়ে আর নাই। আমার ছোট মেয়েটা এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে, তা ভাবতেও পারছি না।’

বড় বোন জলি দত্তও বোনের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, ‘আমার বোনটা সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতো শুধু ওর ছেলেদের একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ দেওয়ার জন্য। একটা বেপরোয়া বাস আমার বোনের সব স্বপ্ন শেষ করে দিল। আমরা এখন এই অনাথ ছেলেদের নিয়ে কোথায় দাঁড়াব?’

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল রাত ৮টার দিকে কর্ণফুলী টানেল মোড়ে কোরিয়ান ইপিজেডের শ্রমিকবাহী আহাদ পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারায়। বেপরোয়া গতির বাসটি মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অন্তত ছয়টি সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে সজোরে ধাক্কা দিলে দুর্ঘটনাটি ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের ঝিওরি গ্রামের বাসিন্দা কলি দত্ত ও ইফা শীল (৪০) নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন আরও ২১ জন। পরে পথচারী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

আনোয়ারা থানার এসআই মো. জুয়েল মিয়া বলেন, ‘ঘাতক বাসটিকে আটক করেছে পুলিশ। তবে চালক ও তাঁর সহকারী পলাতক। নিহতদের মরদেহ স্বজনদের অনুরোধে ময়নাতদন্ত ছাড়াই হস্তান্তর করা হয়েছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে পুলিশ আইনি ব্যবস্থা নেবে।’

কোরিয়ান ইপিজেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। কেইপিজেডে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের গ্রুপ ইন্স্যুরেন্স বা বীমা পলিসি রয়েছে। এ ছাড়া কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কারণে ওই শ্রমিকের পরিবার নিয়মানুযায়ী সার্ভিস ইনস্যুরেন্সের সুবিধাও পাবেন।’

উপমহাব্যবস্থাপক আরও বলেন, ‘নিহত শ্রমিক ঠিক কোন কারখানায় কর্মরত ছিলেন তা চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। কারখানা শনাক্ত হওয়া মাত্রই তাঁর পরিবারের কাছে দ্রুত সব ধরনের আইনি সুবিধা ও আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।’

মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠছে টানেল মোড়

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কর্ণফুলী টানেল সংযোগ সড়কটি চালুর পর থেকে টানেল মোড় দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বিকেল ও সন্ধ্যার পর পোশাক কারখানার ছুটির সময় এখানে হাজারো শ্রমিকের যাতায়াত থাকে। এই ব্যস্ত সময়েও অনেক দূরপাল্লার এবং লোকাল বাস গতির প্রতিযোগিতা করে মোড় পার হওয়ার চেষ্টা করে। এ ছাড়া চাতরী চৌমুহনী বাজার থেকে উল্টো পথে আসা বাস ও ট্রাকগুলো চত্বর না ঘুরেই টানেল সড়কে প্রবেশ করে। এতে এর আগে বাসের ধাক্কায় এক মাইক্রোবাস চালক প্রাণ হারিয়েছেন। নির্দিষ্ট গতিসীমা না মানা এবং পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ কিংবা গতি নিয়ন্ত্রক না থাকায় এখানে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ জাহেদ বলেন, ‘টানেল মোড়ে সন্ধ্যার পর পার হওয়া মানেই জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। গাড়িগুলো যেভাবে আসে, মনে হয় যেন রেসিং ট্র্যাক। প্রশাসন যদি এখনই এখানে কঠোর গতিনিয়ন্ত্রণ না করে, তবে আরও অনেক জীবন অকালে ঝরে যাবে।’

মায়ের ফেরার পথ চেয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় যে ছেলেটি দরজায় দাঁড়িয়ে থাকত, সেই বিজয় দত্তের অপেক্ষা আর কখনো শেষ হবে না। একটি বেপরোয়া গতি চিরতরে স্তব্ধ করে দিল একটি সাধারণ পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনকে।

সাতকানিয়ায় দুই মাদকসেবীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে কারাদণ্ড

টানেল মোড়ে দুর্ঘটনা: মারা গেছে গর্ভের সন্তান, আইসিইউতে সংজ্ঞাহীন মা

পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, বোনের বিরুদ্ধে ভাইকে হত্যার অভিযোগ

চট্টগ্রামে এস আলম গ্রুপের সব কারখানা বন্ধ, কাজ হারালেন হাজারো শ্রমিক

আনোয়ারায় ভূমি বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের ২০০ গাছ নিধন, গ্রেপ্তার ১

বাংলাদেশে প্রবেশের সময় রোহিঙ্গাবাহী নৌকাডুবি, নিখোঁজ ১৩, উদ্ধার ১৮

বাঁশখালীতে মাছের ঘের দখল নিয়ে গোলাগুলিতে নিহত ১, আহত ১০

ফটিকছড়িতে ছেঁড়া তারে বিদ্যুতায়িত হয়ে কৃষিশ্রমিকের মৃত্যু

অনুমোদনহীন ভবনে হাসপাতাল, নেই পরিবেশ ছাড়পত্রও

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস ঢুকে পড়ল দোকানে: নিহত ২, আহত ১৫