হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

জাহাজভাঙা কারখানায় বিস্ফোরণ: ৮ শ্রমিক নিহত, ২ জন আশঙ্কাজনক

সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি 

ফেরদৌস স্টিল জাহাজভাঙা কারখানা। ছবি: আজকের পত্রিকা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল নামের জাহাজভাঙা কারখানায় আজ শুক্রবার সকালে স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিস্ফোরণ ও গ্যাসের বিষক্রিয়ায় ৮ শ্রমিক নিহত ও ২ শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন।

নিহতরা হলেন মো. রানা (২৫), খোকন (২৬), মো. ইদ্রিস (৩০), মো. সুজন (৩৮), পলাশ জলদাস (৩০), সানি জলদাস (২২) এবং দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)। হাবিবুর রহমান (৫০) নামের একজন নিহতের তালিকায় থাকলেও তাঁর মরদেহ ও পরিচয় পাওয়া যায়নি।

নিহতদের স্বজনেরা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর আহত শ্রমিকদের উদ্ধার করে জাহাজভাঙা কারখানার ভেতরে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ফেলে রাখা হয়। আহতদের আর্তচিৎকার শুনে তাঁরা ছুটে গেলেও জাহাজভাঙা কারখানা কর্তৃপক্ষ গেটে তালা ঝুলিয়ে রাখে। বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি জানিয়ে তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের চলে যেতে বলে। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষুব্ধ হয়ে কারখানার গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। জাহাজভাঙা কারখানা কর্তৃপক্ষ ঘটনা ধামাচাপা দিতে আহতদের যথাযথ চিকিৎসা না দেওয়ায় তাঁরা মৃত্যুবরণ করেছে বলে অভিযোগ স্বজনদের।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম জানান, বিস্ফোরণের খবর পাওয়ার পর ওসিকে অবহিত করে জাহাজভাঙা কারখানায় পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তিনি নিজেও ঘটনাস্থলে রয়েছেন।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম হতাহতের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নিহতদের মধ্যে ২ জনের মরদেহ জাহাজভাঙা কারখানায় রয়েছে। অন্য ৬ জনের মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

তৌফিকুল ইসলাম আরও জানান, ‘হতাহতের ঘটনা ঘটে যে স্ক্র্যাপ জাহাজে, সেটি ছিল এলএনজি বহনকারী জাহাজ। এই ধরনের জাহাজে কাটিং কাজ শুরুর আগে গ্যাসমুক্ত করতে হয়। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ তা না করে কাটিং কাজ করায় এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সাগরে জোয়ারের কারণে উদ্ধারকাজ সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। জোয়ারের পানি নেমে ভাটা এলে আবার উদ্ধারকাজ শুরু হবে।’

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক জানান, হাসপাতালে আহত ৬ শ্রমিককে নিয়ে আসা হয়। তাঁদের মধ্যে ৫ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নিহত ৫ জনের মরদেহ চমেক হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।

স্থানীয় জেলেরা জানান, ভাটিয়ারি স্টেশন রোড-সংলগ্ন সাগর উপকূলে মো. লোকমানের মালিকানাধীন জাহাজভাঙা কারখানার ওই স্ক্র্যাপ জাহাজ থেকে লিকেজ হওয়া গ্যাসের তীব্রতা ব্যাপক ছিল। গ্যাসের গন্ধের কারণে তাঁরা কারখানাসংলগ্ন খালে মাছ ধরার নৌকা ভেড়াতে পারেননি। খাল থেকে আধা কিলোমিটার দূরে নৌকা ভেড়াতে হয়েছে।

গ্যাস বিস্ফোরণে নিহতদের লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতদের স্বজনরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকালে জাহাজভাঙা কারখানায় শ্রমিকদের চিৎকার শুনে তাঁরা ছুটে যান। এ সময় হতাহত শ্রমিকদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাঁরা জাহাজভাঙা কারখানায় ভাঙচুর চালান। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, হতাহতের ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা ওই জাহাজভাঙা কারখানায় ভাঙচুর চালায়। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, স্ক্র্যাপ জাহাজের কাটিং কাজের সময় এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। অসাবধানতাবশত গ্যাস লিকেজের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশ সুপার (এসপি) মাহমুদা বেগম জানান, নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ চমেক হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। আর কোনো শ্রমিক হতাহত হয়েছেন কি না, তা ভাটার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের মাধ্যমে আবার তল্লাশি চালিয়ে দেখা হবে। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।