হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে মৃত্যু: ময়নাতদন্ত ছাড়াই ৮ লাশ হস্তান্তর, মামলা হয়নি ৪৮ ঘণ্টায়ও

সোহেল মারমা, চট্টগ্রাম 

ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিস্ফোরণ। ফাইল ছবি

চট্টগ্রামে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে নোঙর করা একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে নয় শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় শিপইয়ার্ডটির সমস্ত কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

এদিকে নিহত শ্রমিকদের মধ্যে আটজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত (পোস্টমর্টেম) ছাড়াই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করার পর তড়িঘড়ি করে দাফন করা হয়েছে। স্বজনদের আবেদনের বরাতে পুলিশ এই পদক্ষেপ সমর্থন করলেও আইন বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, এর ফলে ফৌজদারি আদালতে অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও সীতাকুণ্ড থানায় কোনো এজাহার জমা পড়েনি। সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তাঁরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন।

গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে ভাটিয়ারী স্টেশন রোড-সংলগ্ন সাগর উপকূলে অবস্থিত ‘ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে’ এই দুর্ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকাজে জড়িত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কারখানায় এমটি রাসি নামের এলএনজি-এলপিজি বহনকারী একটি জাহাজের ট্যাংকের অংশ কাটার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

একজন কাটারম্যান একটি ট্যাংকের চারপাশে কেটে ফেলার পর গ্যাস নির্গত হওয়া শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজ করতে থাকা দুই শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন। অচেতন সহকর্মীদের বাঁচাতে গিয়ে আরও দুই শ্রমিক মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হন। উদ্ধার করতে গিয়ে কারখানার ফোরম্যান ও নিরাপত্তা মাস্ক পরিহিত সেফটি অফিসারও ঘটনাস্থলেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন।

পরে সরকারি বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক পরিদর্শনে দুর্ঘটনাস্থলে হাইড্রোজেন সালফাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও অ্যামোনিয়ার মতো মারাত্মক ক্ষতিকর বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

নিহত শ্রমিকদের মধ্যে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের মৌলভীপাড়া ও শনি ঠাকুরবাড়ি এলাকার দুই সহোদর মনসুর উদ্দিন (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮), পলাশ জলদাস (৩০), সানি জলদাস (২২), মতিউর রহমান সাজ্জাদ (২০), হাবিবুর রহমান (৫০) এবং গাইবান্ধার মো. রানা মিয়া ও খোকন রয়েছেন।

নিহত শ্রমিকদের মধ্যে শুধু পাবনার বাসিন্দা ও শিপইয়ার্ডটির সেফটি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আব্দুল আলিম সুজনের (৩৮) লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।

দুর্ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসআরবি) ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের সব ধরনের জাহাজ ভাঙা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থগিত করার আদেশ জারি করেছে। বিএসআরবির মহাপরিচালক জানান, তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত ও কারখানায় কর্মপরিবেশ নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।

ঘটনার নেপথ্য কারণ ও নিরাপত্তার ঘাটতি অনুসন্ধানে মোট তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—শিল্প মন্ত্রণালয় গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দল, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন পরিচালিত তদন্ত কমিটি ও বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) গঠিত নিজস্ব ফ্রেমে কাজ করা প্রতিনিধিদল।

প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এলএনজি বা গ্যাস বহনকারী স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার আগে সেটিকে সম্পূর্ণরূপে ‘গ্যাস-ফ্রি’ হিসেবে সনদপ্রাপ্ত করা আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা যথাযথভাবে পালন করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, নিহত শ্রমিকদের স্বজনেরা লিখিতভাবে ময়নাতদন্ত না চাওয়া ও কোনো অভিযোগ না করার ইচ্ছার কারণেই সুরতহাল শেষে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।

নিহত দুই ভাইয়ের ভগ্নিপতি মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘শুক্রবার অনেক দেরি হয়ে যাওয়ায় লাশ দ্রুত বাড়িতে নিয়ে দাফন করা ছাড়া উপায় ছিল না। তবে পরে কোনো প্রয়োজন হলে আমরা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা জানিয়েছি। আপাতত আমরা মামলা-মোকদ্দমায় যেতে চাচ্ছি না।’

তবে স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনের নেতারা অভিযোগ করছেন, এসব দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে চাপ দেওয়া ও মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণের লোভ দেখিয়ে পুলিশি বা আইনি প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট এ এইচ এম জিয়া হাবীব আহসান আজকের পত্রিকাকে বলেন, অবহেলাজনিত কিংবা কাঠামোগত অবহেলার কারণে মৃত্যু হলে ফৌজদারি মামলায় সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম রিপোর্টই মূল প্রধান সাক্ষ্য-প্রমাণ। পোস্টমর্টেম না থাকলে ভবিষ্যতে আদালতে কারখানার মালিকদের ফৌজদারি দায় প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। ক্ষতিগ্রস্তরা কেবল দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণের আবেদন করতে পারবেন।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি) চট্টগ্রামের সভাপতি তপন দত্ত এটিকে ‘আইনি পথ রুদ্ধ করার চক্রান্ত’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা হাসপাতালে নিহত শ্রমিকদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি যে তারা আতঙ্কিত। মালিকপক্ষ শাস্তি না পেলে ও নিয়মিত সেফটি প্রটোকল না মানলে কারখানায় এমন মর্মান্তিক মৃত্যু বারবার ঘটতেই থাকবে।’

অন্যদিকে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) চট্টগ্রাম জেলার প্রধান আল কাদেরী জয় এটিকে ‘স্বাভাবিক দুর্ঘটনা নয়, বরং কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জাহাজভাঙা ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য লোহা নিষ্কাশনকারী দেশ হলেও এখানে শ্রমিক সুরক্ষার বিষয়টি বরাবরই সমালোচিত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সীতাকুণ্ড উপকূলবর্তী প্রায় ১৫০টি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ইয়ার্ডে বিগত পাঁচ বছরে ১৭৯টি ছোট-বড় দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। গ্রিন শিপ ব্রেকিং রূপান্তরের আন্তর্জাতিক দাবি সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও গ্যাস নির্গমন পরীক্ষায় অবহেলা শ্রমিকদের জীবনকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।