হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

‘পিংক বাসের একটিও প্রতিবন্ধী নারীবান্ধব নয়’

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

রাজধানীর ডেইলি স্টার সেন্টারে বৃহস্পতিবার উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (ডব্লিউডিডিএফ) সেমিনারের আয়োজন করে। ছবি: আজকের পত্রিকা

নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য বিশেষ পরিবহন চালু করা হলেও সেখানে প্রতিবন্ধী নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচল করা দশটি পিংক বাসের একটিও প্রতিবন্ধী নারীবান্ধব নয়। নারীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিবন্ধী নারীদেরও বিবেচনায় নিতে হবে। তাঁদের এড়িয়ে কোনো অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ সফল হতে পারে না।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর ডেইলি স্টার সেন্টারের আজিমুর রহমান কনফারেন্স হলে প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীর অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা নিশ্চিতকরণ বিষয়ক সেমিনারে মূল নিবন্ধ উপস্থাপনকালে এসব কথা বলা হয়। প্রতিবন্ধী নারীদের অধিকার ও ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করা সংগঠন উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (ডব্লিউডিডিএফ) এই সেমিনার আয়োজন করে।

সেমিনারে মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন ডাব্লিউডিডিএফের কর্মসূচি সহসমন্বয়কারী শারমিন আক্তার দোলন। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করার ম্যান্ডেট থাকলেও হয়তো বাজেট বা সময়ের স্বল্পতার কারণে অনেক উদ্যোগে তাঁদের যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না।

উদাহরণ হিসেবে পিংক বাসের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজধানীতে চালু হওয়া ১০টি পিংক বাসের একটিও প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য নয়। প্রতিবন্ধী নারীদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা এত জোর দিয়ে বলা হয়, কারণ তাঁদের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু বিভিন্ন জরিপে প্রতিবন্ধী নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় কম পাওয়া যাচ্ছে। এর পেছনে প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণে ঘাটতি, পরিবারে প্রতিবন্ধিতার বিষয়টি প্রকাশ না করার প্রবণতা এবং সামাজিক কুসংস্কার কাজ করতে পারে।

সেমিনারে বিভিন্ন জরিপ ও জনশুমারির তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবন্ধী পুরুষের সংখ্যা ১৩ লাখ ৩৪ হাজার ১০৫ এবং নারী ১০ লাখ ২৭ হাজার ৪৯৯। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জরিপ ২০২১ অনুযায়ী, প্রতিবন্ধী পুরুষের সংখ্যা ২৬ লাখ ৮০ হাজার এবং নারী ১৯ লাখ ৩০ হাজার। প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপে প্রতিবন্ধী পুরুষের সংখ্যা ২১ লাখ ৯৭ হাজার এবং নারী ১৪ লাখ ৩৮ হাজার ৫৮১। অর্থাৎ সাধারণ জনসংখ্যায় নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় বেশি হলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে নারীর সংখ্যা কম। এর অর্থ হতে পারে, প্রতিবন্ধী নারীদের শনাক্ত করা বা তাঁদের তথ্য জরিপে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। অনেক পরিবার প্রতিবন্ধিতার বিষয়টি প্রকাশ করতে চায় না। ফলে প্রকৃত সংখ্যা জানা না গেলে তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে আয়োজিত আলোচনা বা অনুষ্ঠানে শুধু পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে আসা উচিত। তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা সরাসরি শুনতে হবে। কারণ প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে যাঁরা সেবা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তাঁদের কণ্ঠস্বরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশগম্যতা বা অ্যাক্সেসিবিলিটিকে একটি ভবনকেন্দ্রিক বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। নগর-পরিকল্পনা, সড়ক, ফুটপাত, গণপরিবহন থেকে শুরু করে একটি সেবা গ্রহণের শুরু থেকে শেষ ধাপ পর্যন্ত ‘এন্ড-টু-এন্ড অ্যাক্সেসিবিলিটি’ নিশ্চিত করতে হবে। নগর-পরিকল্পনার মৌলিক মানদণ্ড হিসেবেই প্রতিবন্ধী নারীসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারকারীর নির্বিঘ্ন চলাচলকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন সাইট সেভার্সের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃতা রেজিনা রোজারিও, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম প্রমুখ।

শাহীন আনাম বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা দয়া বা করুণাভিত্তিক কোনো ব্যবস্থা চান না। তাঁরা চান অধিকারভিত্তিক ও প্রতিবন্ধীবান্ধব একটি ব্যবস্থা। তাঁরা চান একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’—যেখানে তাঁদের সক্ষমতা অনুযায়ী সুযোগ দেওয়া হবে এবং প্রয়োজন হলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যদি বলা হয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দক্ষতা নেই, তাহলে সেই দক্ষতা তৈরির দায়িত্ব কার—সেটিও ভাবতে হবে। দক্ষতা উন্নয়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে একই সঙ্গে সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের জন্য বৈষম্যহীন পরিবেশ তৈরি করা।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন ডাব্লিউডিডিএফের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি, সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের চেয়ারপারসন শিরিন আখতার। আরও উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর আনিকা রহমান লিপি, ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা বিশেষজ্ঞ ভাস্কর ভট্টাচার্য, অ্যাক্সেস বাংলাদেশের চেয়ারপারসন মহুয়া পাল প্রমুখ।