হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

আদালতের আদেশ পেলেও ৬৩ বিদেশিকে এখনই রিমান্ডে নিতে পারছে না তদন্ত সংস্থা

সোহেল মারমা, চট্টগ্রাম 

ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম নগরে অনলাইন প্রতারণায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ৬৩ বিদেশি নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত প্রত্যেককে দুই দিনের রিমান্ডের আদেশ দিলেও ভাষাগত জটিলতার কারণে শিগগির তাঁদের হেফাজতে নিতে পারছে না মামলাটির তদন্ত সংস্থা কাউন্টার টেররিজম ইউনিট।

তদন্ত সংস্থা বলছে, গ্রেপ্তার বিদেশিরা চীন, লাওস, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও নেপাল—এই পাঁচ দেশের নাগরিক। তাঁদের মধ্যে দু-তিনজন ছাড়া কেউই ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন না। চক্রটির অপরাধমূলক তৎপরতার তথ্য সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে হলে তাঁদের নিজ ভাষায় কথা বলতে হবে, যাতে তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে পারেন। এ জন্য দোভাষী নিয়োগসহ দুটি পদ্ধতির কথা ভাবলেও এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে সিএমপি কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপকমিশনার মো. শামীম হোসেন এবং মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা রাসেল মাহমুদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তাঁরা ফোন না ধরায় আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য জানা যায়নি।

তবে একই সংস্থার অতিরিক্ত উপকমিশনার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজকের পত্রিকাকে বলেছেন, আসামিদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রাথমিকভাবে দুটি পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়েছে। একটি হচ্ছে ডিভাইসের মাধ্যমে। ডিভাইস দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা গুগলের সহায়তায় ভাষা অনুবাদ করে আসামিদের নিজ ভাষায় জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে। অন্যটি হচ্ছে দোভাষী নিয়োগের মাধ্যমে। তবে দোভাষী নিয়োগপ্রক্রিয়ার বিষয়টি একটু সময়সাপেক্ষ।

এই কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত কোন পদ্ধতি ব্যবহার করে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বা কবে আসামিদের রিমান্ডে আনা হবে, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

তবে খুব শিগগির আসামিদের রিমান্ডে আনা হবে বলে জানান চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, আসামিদের ভাষাগত সমস্যার জন্য দোভাষী নিয়োগ বা অন্য কোনো পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে আশা করছি, খুব শিগগির এটা চূড়ান্ত হবে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পাঁচটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চীনা, পাকিস্তানি ও নেপালির বসবাস রয়েছে। সামান্য বসবাস রয়েছে ভিয়েতনামিদের। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওসের জন্য দোভাষী খুঁজে বের করা কঠিন হতে পারে। আর গ্রেপ্তার বিদেশি নাগরিকদের অর্ধেকের বেশি লাওসের বাসিন্দা।

এতে প্রাথমিকভাবে ডিভাইসের পদ্ধতি ব্যবহার করে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

এর আগে আজ মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহিদুল ইসলামের আদালত পুলিশের সাত দিনের রিমান্ডের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৬৩ বিদেশি নাগরিককে প্রত্যেককে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ হাসান ইকবাল চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, গত শুক্রবার গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশি নাগরিককে আদালতে তোলার পর প্রত্যেক আসামিকে সাত দিন রিমান্ডের আবেদন করেছিল পুলিশ। মঙ্গলবার আদালত রিমান্ডের আবেদনের ওপর শুনানি শেষে প্রত্যেক আসামিকে দুই দিন রিমান্ড মঞ্জুরের আদেশ দেন। একই সঙ্গে আগামী ২০ দিনের মধ্যে রিমান্ড প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে বলা হয়েছে।

কাউন্টার টেররিজম সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারের পর তাঁদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে অপরাধমূলক তৎপরতা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু দু-তিনজন পাকিস্তানি নাগরিক ছাড়া বাকিরা কেউই নিজ দেশের ভাষা ছাড়া ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষা বুঝছেন না। তদন্ত কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাঁরা কোনো কথা বলতে পারছেন না। কাউন্টার টেররিজম যে তথ্য পেয়েছে, তা দু-তিনজন পাকিস্তানি নাগরিকের কাছ থেকে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে এবং পরদিন শুক্রবার সকাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানাধীন কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর রোডের একটি ভবনের ১৪টি ফ্ল্যাট থেকে ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করে সিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও খুলশী থানা-পুলিশ।

তাঁদের মধ্যে লাওসের ৩৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন ও চীনের ৫ জন এবং ভিয়েতনাম ও নেপালের ১ জন করে নাগরিক রয়েছেন। এ সময় অভিযানে ওই ফ্ল্যাট বাসা থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১৩৪টি মুঠোফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, ৪টি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্রসহ আরও বেশ কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় খুলশী থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে করা মামলায় পরে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে চট্টগ্রাম কারাগারে পাঠানো হয়।

এ ছাড়া একই ঘটনায় বিদেশি নাগরিকদের দেশে আনা মো. মহসীন নামের বাংলাদেশি এক সহযোগীকে গত শনিবার চট্টগ্রাম নগরের খুলশী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই দিন রাতেই তাঁকে একটি মাদকের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রহিম বলেন, ৬৩ বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে মহসীনের সম্পর্ক রয়েছে। মহসীনের পাঠানো ১১৮ গ্রাম কোকেনের সূত্র ধরে মূলত খুলশীতে অবস্থান করা ওই ৬৩ বিদেশি নাগরিকের সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি বিদেশিদের জন্য আটতলা ভবনটি ভাড়া করে দেন। বিদেশি নাগরিকদের পাসপোর্টও তাঁর কাছে জমা ছিল। মহসীনের পেছনে থাকা অন্যদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

তদন্ত সংস্থা কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সূত্রগুলো জানায়, ওই বিদেশিরা মূলত অনলাইনকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের সদস্য। নিজ নিজ দেশে অভিযানের মুখে টিকতে না পেরে তাঁরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাঁদের নেটওয়ার্কের সদস্যরা রয়েছেন।

চক্রটির প্রাথমিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা গেছে, তাঁরা অনলাইন শপিং সাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্যের অর্ডার নিয়ে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ ও পণ্য না দিয়ে টাকা আত্মসাৎ করেন। বিভিন্ন ধরনের ওয়েবসাইট ও অ্যাপ হ্যাক করার প্রক্রিয়া করেছিলেন, এ জন্য ভবনের ফ্ল্যাটে বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস স্থাপন করেছিলেন। ওই বিদেশি নাগরিকদের কয়েকজন জানান, তাঁরা মহসীনের মাধ্যমে জুন নাগাদ বাংলাদেশে আসেন। প্রথমে ঢাকায় দুই দিন অবস্থানের পর চট্টগ্রামে চলে আসেন।